প্রায় ১০ বছরের পরিকল্পনা ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার দেখতে যাবো। শুনেছি সে এক স্বপ্নিল উদ্যান। প্রাকৃতিক ভাবে শতশত ফুল ফোটে সেখানে। বহুবার পরিকল্পনা নিয়েও ভেস্তে যায়, কখনো বন্ধু যোগাড় হয় না, কখনো আবার সময়। যাই হোক অবশেষে দুই বন্ধু চূড়ান্ত  করেই ফেললাম, এবার যাবোই। তারপর কাঁধ-ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুত হলাম ফুলের স্বর্গরাজ্যে যাওয়ার।

১২ জুলাই ঢাকা থেকে রওনা হলাম বেনাপোল স্থলবন্দরের দিকে। সেখানে দিয়ে বর্ডার পার হয়ে কোলকাতা যাব। তারপর কোলকাতা থেকে গন্তব্যে। ঢাকার মালিবাগের সোহাগ পরিবহন কাউন্টার থেকে বাস ছাড়ল রাত ১০.৩০ মিনিটে। আগ্রহের আরেক কারণ, আমাদের বাস পদ্মা সেতু দিয়ে যাবে। 

ভোর ৪টার দিকে বেনাপোল পৌঁছলাম। কিন্তু বর্ডার খুলবে সকাল সাড়ে ৬টায়। এতক্ষণ অপেক্ষা, কি আর করার! দুই বন্ধু বসে অপেক্ষা আর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সময় কাটালাম। বর্ডার খুলে কার্যক্রম শুরু হলো কিন্তু দুই পারে প্রায় হাজার খানেক মানুষ। বুঝতে পারছিলাম অনেক সময় লাগবে। বেলা ১২ টার দিকে দুই দেশের ইমিগ্রেশন শেষ হলো। এবার কোলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। যেতে সময় লাগলো প্রায় ৫ ঘণ্টা।

১৪ জুলাই বেলা ১২ টায় আমাদের ফ্লাইট কোলকাতা থেকে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে। যথাসময়েই ফ্লাইট ছাড়ল। আমরা দেরাদুন গিয়ে পৌঁছলাম বেলা ৩ টার দিকে। এয়ারপোর্ট থেকে নেমেই দেখি হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া ছিলো খুবই আরামদায়ক। তাপমাত্রা ২০ এর মতো হবে। এয়ারপোর্ট স্ট্যান্ড থেকে একটা ট্যাক্সি রিজার্ভ করলাম ঋষিকেষ বাস স্ট্যান্ডের কাছে। 
 
কিন্তু এখানে এসে একটা সমস্যায় পরতে হলো। বিদেশীদের থাকার হোটেল পাচ্ছিনা। সাধারণত কোনো বিদেশী হোটেলে থাকলে হোটেল কর্তৃপক্ষের একটা ‘সি ফর্ম’ ফিলাপ করে থানায় জমা দিতে হয়। কিন্তু সাধারণ হোটেলে এই সুবিধা থাকে না। আমরা ঋষিকেষ এলাকায় কোনো হোটেলে এই সুবিধা পাচ্ছি না। অবশেষে একটি হোটেল ম্যানেজ হলো। হোটেলে উঠে সবাই ঘুম। তার আগে খাবার এনে খেলাম। পরদিন খুব ভোরে রওনা দিতে হবে।

ভোর ৫ টায় রুম চেক আউট করে বের হলাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। বাস ছাড়ল সকাল ৬ টায়। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বাস ছুটে চলল আর সঙ্গে চলছে গঙ্গা নদী। ঘণ্টাখানেক চলার পর ড্রাইভার সাহেব নাস্তার ব্রেক দিল। বাস থেকে নেমে এক হোটেলে খেতে বসলাম, এখানে হালকা নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে বাস আবারও চলতে শুরু করল। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা, সারা দিনের ব্যাপার। শুনেছি বাস অন্তত ৩ বার ব্রেক দিবে।
 

প্রায় ৮০ কিলোমিটার যাওয়ার পর পৌঁছলাম এক ঐতিহাসিক জায়গায়। নাম দেবপ্রয়াগ। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম কি অপরূপ দুই স্বর্গীয় নদী। ভাগীরথী আর অলকানন্দা মিলে তৈরি হলো এক পবিত্র নদী যার নাম গঙ্গা। মানে এটাই সে জায়গা, যেখান থেকে অফিসিয়ালি গঙ্গা নদী শুরু হয়েছে। মানে আমাদের পদ্মা। চিন্তা করা যায় এখান থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার । এতো পথ পাড়ি দিয়ে এই গঙ্গা বাংলাদেশে পদ্মা নামে প্রবেশ করেছে। কিছু ছবি আর ভিডিও নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে রইলাম। 
 
বাস আবার যাত্রা শুরু করলো। পাহাড়ি ভয়ংকর সব বাঁক দিয়ে আমাদের বাস ছুটে চলল যশিমঠের দিকে। বিকেল ৫ টার দিকে পৌঁছলাম যশিমঠ। মাঝে আরেক বার আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি ও ছিল। যাই হোক বাস থেকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে নামলাম । একটা ভয় ছিল আবার সেই হোটেল নিয়ে। বিদেশীদের হোটেলের ব্যবস্থা আছে কি নাই? এক হোটেলে গেলাম, গিয়ে আগেই বলে নিলাম আমরা বিদেশী। হোটেলে থাকার ব্যবস্থা আছে কী ? ইনি এক কথায়ই রাজী হয়ে গেলেন। আমরাও দেরি করলাম না। ১৫০০ রুপি ভাড়া দিয়ে একটা রুম নিয়ে নিলাম। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হলাম। তারপর খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম। 
 
পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। কারণ আজ আমাদের অনেক দূরে যেতে হবে। ট্র্যাকিং ও করতে হবে। তাই আর দেরি করলাম না। চলে গেলাম যশিমঠ থেকে গোবিন্দঘাট যাওয়ার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। সেখানে গিয়ে হালকা নাস্তা করে ট্যাক্সিতে উঠলাম। গাড়ি চলতে লাগলো হিমালয়ের বড় বড় পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, কী চমৎকার সেই দৃশ্য। আমরা কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দেখাল এই জায়গার নাম বিষ্ণু প্রয়াগ। মন ভরে সেই জায়গা উপভোগ করলাম। তারপর আবার আমাদের গাড়ি চলা শুরু করল। প্রায় ঘণ্টা-খানেক যাওয়ার পর আমরা পৌঁছলাম গোবিন্দ-ঘাট। 
 
প্রায় ২০-২৫ মিনিট আঁকাবাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে আমরা অবশেষে পৌঁছলাম পুলনা গ্রাম। এখান থেকেই আমাদের ট্র্যাকিং শুরু হবে গাংগারিয়া গ্রামের উদ্দেশ্যে। শুরুতে আমরা একজন পোর্টার নিয়ে নিলাম। আমাদের দুই বন্ধুর ব্যাগ দিয়ে দিলাম তার কাছে। কারণ ব্যাগ নিয়ে ট্র্যাক খুব কষ্টসাধ্য। পোর্টারের চার্জ নিলো এক হাজার রুপি। একজন পোর্টার কমপক্ষে ২০ কেজি বহন করতে পারে, এক্ষেত্রে আমাদের দুই জনের ব্যাগ তেমন ভারি হবে না। খুব বেশি হলে ১৩-১৪ কেজি। যাই হোক, অবশেষে পাহাড়ের উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। প্রায় ১০ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। হাঁটতে কষ্ট হলেও আশপাশের প্রকৃতি দেখে সেই কষ্ট দূর হয়ে যায় নিমিষেই। দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণা বয়ে চলেছে। সবুজ পাইন দেবদারু গাছের সারি। দুই পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলছে খরস্রোতা নদী। সেই নদীর উপর ছোট ছোট ব্রিজ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। 
 

দুপুর ২টার দিকে এসে পৌঁছলাম পুলনা গ্রামে। প্রায় ৬ ঘণ্টা লাগল আমাদের এই ১০ কিলোমিটার ট্র্যাক করে আসতে। অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে গেলাম, কিন্তু আমাদের সঙ্গে অনেক অভিযাত্রী ছিল। ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার বাদেও এই জায়গাটা খুব উল্লেখযোগ্য। কারণ এখানে একটা ট্যাম্পল আছে, যার নাম হেমকুন্দ সাহিব ট্যাম্পল। এই হেমকুন্দ সাহিব ভ্যালি অব ফ্লাওয়ারের পাশে প্রায় ১৪ হাজার ফিট উপরে পাহাড়ের চূড়াতে। এখানে অনেক শিখ ধর্মের মানুষ আসে। এই ট্যাম্পল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত শিখ ট্যাম্পল। আমাদের প্ল্যান ছিল এখানেও যাওয়ার, কিন্তু পরে সময়ের স্বল্পতার জন্য যাইনি। শুধু ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার দেখে চলে আসি। 
 
পরদিন সকালে ১৭ জুলাই আমরা নাস্তা শেষে বের হলাম ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রায় ৪ কিলোমিটারের ট্র্যাকিং। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর এলো চেক পোস্ট। সেখান থেকে পারমিট নিলাম। প্রত্যেক বিদেশিদের জন্য ৬০০ রুপি করে। পারমিট নিয়ে সামনে চলা শুরু করলাম। যত সামনে যাচ্ছি তত মনে হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। পুষ্পবতী নদী পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলছে।
 
অবশেষে পৌঁছলাম ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার। নয়নাভিরাম ভ্যালি। কি যে সুন্দর লাগছিলো দেখতে? কিন্তু এটা তো মূল ভ্যালি নয়। সেখানে তো অনেক ফুল ফুটে থাকবে। আমরা চলতে শুরু করলাম ভ্যালি ধরে আরও সামনে।

আরো প্রায় আধাঘণ্টা চলার পর চোখের সামনে ফুটে উঠলো সেই ভ্যালি। সে এক স্বর্গীয় বাগান। প্রায় ২ঘণ্টার মতো ছিলাম ফুলের ভ্যালিতে। মন ভরে উপভোগ করলাম। এর সৌন্দর্য আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। হৃদয়ে অনেক স্মৃতি নিয়ে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার দেখে বিকেলে ফিরে আসলাম পুলনা গ্রামে। ভ্যালিতে রাতে থাকার অনুমতি নেই। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই ভ্যালি খোলা থাকে। এছাড়া অন্য সময় থাকা যায় না।

ফিরে আসলাম গাঙ্গগারিয়া গ্রামে। এসে বিকেলে খাবার খেয়ে রেস্ট। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুম। সকালে উঠে আবার আমাদের পাহাড়ের নিচে নামতে হবে। যেতে হবে পুলনা গ্রাম হয়ে গোবিন্দঘাট। সেখান থেকে আবার ট্যাক্সি নিয়ে যোশিমঠ হোটেলে যেতে হবে। তাই দ্রুতই বের হলাম। বেলা১০ টার দিকে পৌঁছে গেলাম পুলনা গ্রামে। সেখান থেকে গেলাম গোবিন্দঘাট। হালকা খাবার খেয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম যোষিমঠের উদ্দেশ্যে। অবশেষে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর গাড়ি ছাড়ল। 

ঘণ্টাখানেক পর এসে পৌঁছলাম যোশিমঠ। প্ল্যান ছিলো পরদিন চলে যাবো। কিন্তু পরে ভাবলাম, এখানে যখন এসেছি তাহলে অলি গ্রামটাও দেখে যাই। পাহাড়ের একদম উপরে এই গ্রাম। শুনেছি এখান থেকে নাকি নন্দা দেবী পাহাড় দেখা যায়। নন্দা দেবী ভারতের সবচেয়ে উঁচু পর্বত। অলি খুব সুন্দর কিন্তু সেটা শীতের সময়। শীতে এখানে প্রচুর স্নো-ফল হয়। 

তারপর গেলাম ক্যাবল কার স্টেশনে। ভাগ্য খারাপ প্রায় ১ ঘণ্টা বসে রইলাম। কিন্তু ক্যাবল কার আর ছাড়ছে না। কারণ মিনিমাম ৮ জন লোক হলেই ছাড়বে, তা না হলে ছাড়বে না। আমরা অনেক সময় বসে রইলাম কেউ আর আসলো না। এর কারণ এখন অফ সিজন চলছে। ঘণ্টা-খানেক অপেক্ষার পর ট্যাক্সি বুক করলাম। অবশেষে অলি পৌঁছলাম বিকেলে। যাওয়ার পথে আপেল গাছ দেখতে পেলাম। আবারো আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে গাড়ি মনে হচ্ছে আকাশে উঠে যাচ্ছে। এতো উপরে সেই অলি। অলি জায়গাটা দেখে কাশ্মীরের গুলমার্গের কথা মনে পরল। অলি খুব সুন্দর। আমরা পাহাড়ের বুকে শুয়ে উপভোগ করছি, আর দেখছি অলিকে। 
 
অলিকে মন ভরে দেখে নিচে নামতে শুরু করলাম। রেখে আসলাম অনেক স্মৃতি। আফসোস রয়ে গেলো আর কিছুদিন এখানে যদি থাকতে পারতাম। তাহলে হয়তো কিছুটা মন শান্ত হতো। কিন্তু কি আর করার, ফিরে যেতে হবে বহু দূর। অলি থেকে নিচে নামার সময় দেখতে পেলাম সেখানে প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই আপেল গাছের বাগান, সে কি চমৎকার দেখতে।  আমরা গাড়ি থামিয়ে একটা বাগানের সামনে থামলাম। কিছু আপেল খেলাম আর ক্যামেরায় বন্দি করে নিলাম সেসব দৃশ্য। 
 
অবশেষে এসে পৌঁছলাম যোশিমঠ। হোটেলে রেস্ট নিলাম, পরদিন খুব সকালে হোটেলের নিচেই বাস পেলাম ঋষিকেষ যাওয়ার। বাসে উঠে গেলাম। প্রায় ১০ ঘণ্টার যাত্রা শেষে আবারো এসে পৌঁছলাম ঋষিকেষ। ঋষিকেষ থেকে দিল্লি। দিল্লি থেকে ঢাকা।

লেখক: মাহবুব সাকিব; ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট ও মাউনটেন ট্র্যাকার।