জেট ফুয়েল প্রাইস : সরু আলোর পথটুকু রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত

Kamrul Islam

১৮ মে ২০২২, ০৩:৩৩ পিএম


জেট ফুয়েল প্রাইস : সরু আলোর পথটুকু রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রার শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন (১.৫ কোটি) মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকেন আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো। 

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারণে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রমুখ। 

কোভিডকালীন সময় ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ছিল ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল সর্বোচ্চ দাম। যা একটি খাতকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়। 

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় বিদেশি সব এয়ারলাইন্স এর সঙ্গে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিল এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে অ্যারোনোটিক্যাল ও নন-অ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিল এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়। 

এই সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে। 

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সঙ্গে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সব ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাই সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে। 

জেট ফুয়েল প্রাইসসহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমুখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।     

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

জেডএস

Link copied