পাঁচ বছরের ক্যান্সারযুদ্ধ জয় করে ঢাবিতে ‘বি’ ও ‘সি’ ইউনিটে শততম নুহা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন হাজারো শিক্ষার্থীর মতো নুসরাত জাহান নুহাও অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তার অপেক্ষার পেছনের গল্পটি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। পাঁচ বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই, একের পর এক কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চিত জীবনের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে তার পথ। সবকিছুকে পেছনে ফেলে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে শততম এবং ‘সি’ ইউনিটেও শততম স্থান অর্জন করেছে এই ক্যান্সারজয়ী শিক্ষার্থী।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নুহা আক্রান্ত হন অস্টিওসারকোমা (Osteosarcoma) নামে একটি ঝুঁকিপূর্ণ হাড়ের ক্যান্সারে। তার আগে ছিল একদম স্বাভাবিক কৈশোর। হঠাৎ করেই সেই জীবন থমকে যায়। শুরু হয় হাসপাতাল আর চিকিৎসার দীর্ঘ অধ্যায়। কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার আর ভয়ংকর দিনগুলো- ক্যান্সারের চিকিৎসা সহজ ছিল না। এক পর্যায়ে কেমোথেরাপির জন্য নুহার শরীরে ক্যানোলা দেওয়ার মতো শিরাও পাওয়া যাচ্ছিল না। মাথার চুল পড়ে যায়। মাত্র ১৪–১৫ বছরের একটি মেয়ের অসহনীয় যন্ত্রণা পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছিল।
একসময় চিকিৎসকেরা নুহার পা কেটে ফেলার কথাও বলেন। পরে সিদ্ধান্ত হয়, ডান পায়ের টিবিয়া হাড় কেটে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রস্থেটিক ডিভাইস বসানো হবে। এর ফলে পা আর কখনো স্বাভাবিকভাবে বাড়বে না। সামান্য অসাবধানতায় পড়ে গেলে আজীবন হুইলচেয়ারে বসে থাকার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এই লড়াইয়ে নুহার বড় বোন মণি ছিলেন নীরব এক যোদ্ধা। বোনের সব প্রয়োজন সামলেছেন তিনি। তার বাবা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। একা হলে চোখ মুছতেন, সন্তানদের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করতেন।
নুহা যখন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিল, তখন তার মায়ের শরীরেও ক্যান্সার ধরা পড়ে। এর আগে নুহার নানাও ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। একের পর এক দুঃসংবাদেও পরিবারটি ভেঙে পড়েনি। লড়াই চালিয়ে যাওয়াই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র পথ। দীর্ঘ চিকিৎসা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর পড়াশোনার বিরতির মধ্যেও নুহা এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ অর্জন করে। এরপর এইচএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ–৫ পেয়ে বোর্ডে ১৭তম স্থান অর্জন করেন।
হলি ক্রস কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও তিনতলায় ক্লাস হওয়ায় শারীরিক দুর্বলতার কারণে সেখানে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন করে শুরু করেন নুহা। সেখান থেকেই তার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষুধা আরও তীব্র হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নুহার স্বপ্ন। ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষার আগের রাতেও তিনি হাসপাতালে ছিলেন। এরপর জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়েই অংশ নেন ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষায়। সেখানেও অর্জন করে শততম স্থান।
এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২তম এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭তম স্থান অর্জন করেন তিনি।

ক্যান্সারজয়ী এই শিক্ষার্থী ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুরো বিষয়টা নিয়ে আমার নিজের কাছেই মনে হয়, আল্লাহ আমার জন্য অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছিলেন। কেমোথেরাপির যন্ত্রণা ছিল ভয়ংকর। বিশেষ করে কেমো নেওয়ার তিন দিন খুব কষ্ট হতো। কিন্তু তারপরও কোথা থেকে জানি এক ধরনের শক্তি পেতাম। আমি খুব কম কেঁদেছি, কারণ বাসার মানুষদের সামনে দুর্বল হতে চাইনি। একসময় মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা ছিল। পরে বুঝলাম বাস্তবতার সঙ্গে সেটার মিল নেই। তখন সিদ্ধান্ত নিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ব, আব্বুর ইচ্ছা পূরণ করব।
এই যাত্রায় বন্ধুদের ভূমিকা অনেক বড়। পরিবার কখনোই বাড়তি চাপ দেয়নি। শেষ চার মাস আমি নিজেকে একজন সাধারণ পরীক্ষার্থী হিসেবেই দেখেছি। আমি বিশ্বাস করেছি, আমি পারব। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমার শরীরে কোনো ক্যান্সার সেল নেই।
নুহার বড় ভাই খালিদ মাহমুদ খান বলেন, নুহা শুধু আমার বোন নয়, সে সবার বোন। ও কারও সহানুভূতি চায় না, শুধু ভালোবাসা আর দোয়া চায়।
১৪ বছর বয়সে নুহা যখন হাসপাতালের বেডে কেমোথেরাপির অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, বারবার বমি করছিল, শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছিল, ঠিক তখনই তার সহপাঠীরা স্কুলে যাচ্ছিল, টিচারদের কাছে পড়ছিল, বাসায় পড়াশোনা করছিল, হাসি-আনন্দে দিন কাটাচ্ছিল, করোনার সময়টাকে নিজেদের মতো করে উপভোগ করছিল। আর নুহা? সে শুধু দিন গুনছিল- অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হবে।
খালিদ বলেন, আমাদের অজুহাতগুলো কোথায় আমি জানি না। আর এটা আমি শুধু বোন হিসেবে বলছি না- আপনার বোন যদি নুহা হতো, আমিও একই কথা বলতাম। চলুন, আমরা অজুহাত না দেই। একটু চেষ্টা করি। নুহার মতো ইচ্ছাশক্তি আমাদের সবার মনে সঞ্চারিত হোক। আমরা সবাই যেন জীবনে সফল হতে পারি।
সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্যান্সারগুলোর একটি অস্টিওসারকোমাকে হার মানিয়ে সে শুধু সুস্থই হয়নি, দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শততম স্থান অর্জন করেছে। নুহা শুধু একটি সফলতার গল্প নয়- সে ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর বিশ্বাসের এক জীবন্ত উদাহরণ।
এসএআর/এমএসএ