‘চার তলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়, ডান পা ৬ আর বাম পা ৭ টুকরো হয়’

‘তোরা শিবির করিস। তোদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। একটু পরে তোদের গণজাগরণ মঞ্চে নিয়ে যাবো। সেখানে তোদের মেরে আমরা এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা হবো।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০০৮-০৯ সেশনের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হলটির তৎকালীন শিবির সভাপতি রাকিবুল ইসলামকে কথাগুলো বলেছিলেন ছাত্রলীগ নেতারা।
আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রশিবিরের ঢাবি শাখা আয়োজিত ‘নির্যাতিতের আর্তচিৎকার: গেস্টরুম ও গণরুমের ভয়াবহতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করেন রাকিবুল ইসলাম। ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হাফিজুর মোল্লা ও আবু বকর ছিদ্দিকের স্মরণে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
ছাত্রলীগের নির্যাতনের ভয়াবহতা উল্লেখ করে সাবেক শিবির নেতা রাকিবুল বলেন, ‘আমি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল শাখা শিবিরের সভাপতি ছিলাম। ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আসরের নামাজের পরে আমি হলের রুমে বসে পড়াশোনা করছিলাম। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন ক্যাডার টেনে হিঁচড়ে আমাকে রুম থেকে বের করে ৪৬২ নং রুমে নিয়ে যায়। এরপর তারা আমার ফোন চেক করে। ফোনে কোনো কিছু না পেয়ে তারা আমাকে ক্রিকেট ব্যাট, স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ইত্যাদি দিয়ে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে আমি ফ্লোরে নিথর হয়ে পড়ে গেলে তারা আমার শরীরের ওপর ওঠে নৃত্য করা শুরু করে।’
তিনি বলেন, ‘এর কিছুক্ষণ পরে দেখি তারা আমার জুনিয়র বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আব্দুল্লাহ আল নকীকে ধরে এনে তার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে আমি তাদের কাছে পানি চাইলে তারা আমাকে প্রশ্রাব এনে দেয়। এরপর তারা আমাকে চার তলার ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়।’
তিনি বলেন, ওই দিনের নির্যাতনে আমার ডান পা ৬ টুকরো এবং বাম পা ৭ টুকরো হয়ে যায়। আমি মানসিক ট্রমায় চলে যাই। আমার একাডেমিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। এরপর আমার একটা মাস্টার্সের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার আগের রাতে হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আমাকে ফোন দিয়ে বলে- তুই যদি আগামীকাল পরীক্ষা দিতে আসিস তাহলে আগেরবার তো তোকে পঙ্গু করেছি, এবার তোর মাথাটা কেটে রেখে দিবো।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা আমাকে নির্যাতন করে পুলিশে দেয়। নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখে পুলিশ আমাকে ছাড়তে চেয়েছিল, কিন্তু আমার শিক্ষক তৎকালীন ঢাবি প্রক্টর আমজাদ হোসেন আমাকে ছাড়তে দেয়নি। নির্যাতনকারীদের অনেকেই এখনও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কেউ বর্তমানে এনএসআইয়ে, কেউ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগে শিক্ষকতা করছে, অনেকেই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি করে বেড়াচ্ছেন।
এ সময় সোচ্চার স্টুডেন্ট নেটওয়ার্কের ঢাবি শাখা সভাপতি ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস বিন মুনির বলেন, পৃথিবীতে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির রয়েছে। কিন্তু এদেশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসের কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না তা আমাদের জানা নেই।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে হলের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত গণরুম-গেস্টরুম করতে হতো। ছাত্রলীগের প্রোগ্রামের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে হতো। কেউ এসব না করলে তাকে প্রচন্ড রকমের শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হতো। এসব নির্যাতনের কারণে শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতো। তাদের আর পড়াশোনার মানসিকতা থাকতো না।'
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মিফতাহুল হুসাইন আল মারুফ বলেন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো বন্ধ করে দেয় তখন এই গণরুম-গেস্টরুম কালচার চালু হয়। পরবর্তীতে ছাত্রলীগ এসে এটিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের খুন করার জন্য শিবির পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে শিবির মারা জায়েজ করা হয়েছে। আমরা দেখেছি আবরার ফাহাদ, বিশ্বজিৎকে এই শিবির সন্দেহেই হত্যা করা হয়েছিল।
ঢাবি শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন বলেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে এটা প্রত্যেকটি ছাত্রসংগঠনের দায়বদ্ধতা আছে গণরুম-গেস্টরুমের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার। ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধ। তাই আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করছি।
এসএআর/এনএফ