বিজ্ঞাপন

চারুকলায় শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শেষ ৮০ ভাগ

অ+
অ-
চারুকলায় শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শেষ ৮০ ভাগ

ঢাকা শহরজুড়ে এখনও বৈশাখের আনুষ্ঠানিক আমেজ পুরোপুরি ছড়িয়ে না পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এখন পুরোদমে চলছে বাংলা নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি। অনুষদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে শিল্পচর্চার এক ব্যস্ত, বর্ণিল ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এগিয়ে চলছে এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। আয়োজকরা জানান, সার্বিক কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব প্রস্তুতি শেষ হবে।

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে এ আয়োজন। এবার শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।

dhakapost

রোববার (১২ এপ্রিল) চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালজুড়ে আঁকা হচ্ছে নানান চিত্র। এসব দেয়ালচিত্রে উঠে আসছে গ্রামীণ জীবন, লোকজ ঐতিহ্য এবং বাংলার সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। জয়নুল গ্যালারির সামনে চলছে মাটির সরায় আল্পনা আঁকার কাজ। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে গ্রামবাংলার দৃশ্যপট, বাঘ, প্যাঁচা ও বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। শোভাযাত্রার অর্থসংগ্রহের অংশ হিসেবে এসব শিল্পকর্ম ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রিও করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অনুষদের খোলা প্রাঙ্গণে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, শোভাযাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছে প্রতীকী মোটিফগুলো। এবারের আয়োজনে লোকজ ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তুলে ধরতে রাখা হয়েছে পাঁচটি প্রধান মোটিফ— লাল ঝুঁটির বিশাল মোরগ, নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে কাঠের হাতি, শান্তির পায়রা, বড় দোতারা এবং টেপা আকৃতির ঘোড়া। বাঁশ ও বেত দিয়ে এসব মোটিফের কাঠামো তৈরি শেষ হলেও তখনও চলছিল শেষ পর্যায়ের কাজ। 

dhakapost

প্রধান মোটিফের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় যুক্ত হচ্ছে ছোট ছোট আরও নানা প্রতীকী উপকরণ। একই সময়ে চারুকলার আঙিনায় পাঁচটি পটচিত্রেও শিল্পীরা শেষ মুহূর্তের রঙ-তুলির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। “বাংলাদেশ, গাজীরপট, আকবর, বনবিবি ও বেহুলা” এই পাঁচটি ভিন্নধর্মী পটচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নানা আখ্যান ও ঐতিহ্যের উপাদান।

প্রস্তুতির এই শেষ সময়টুকু দেখতে চারুকলায় ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি পরিবার নিয়েও অনেকে ঘুরে দেখছেন পুরো আয়োজন। প্রস্তুতিস্থল ঘুরে দেখছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, “প্রতিবছরই চারুকলার এই আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করে। পয়লা বৈশাখের আগে মুখোশ আর বিশাল প্রতিকৃতি তৈরির এই শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা দেখার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ আছে।”

বিজ্ঞাপন

dhakapost

শোভাযাত্রার সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আমাদের কাজ আশি শতাংশই শেষ। নিরলসভাবে এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব বলে আশা করছি।”

নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আমাদের প্রক্টরিয়াল টিমও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। 

পাঁচ মোটিফে প্রতীকী বার্তা

এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রার পাঁচটি প্রধান মোটিফের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সমকালীন বার্তা। কেন্দ্রীয় মোটিফ হিসেবে রাখা হয়েছে বিশাল মোরগের প্রতিকৃতি। এটি নতুন শুরু, জাগরণ এবং আলোর আগমনের প্রতীক। অন্ধকার পেরিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে এই প্রতীক।

dhakapost

দোতারাকে ধরা হয়েছে বাঙালির লোকসংগীতের প্রাণ হিসেবে। এটি একদিকে সাংস্কৃতিক শেকড়ের স্মারক, অন্যদিকে বাউল ও লোকশিল্পীদের অবমূল্যায়নের বাস্তবতারও প্রতীক। নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে নির্মিত কাঠের হাতি লোকঐতিহ্য, শক্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে স্থান পেয়েছে।

টেপা আকৃতির ঘোড়া গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনযাপন ও শৈশবস্মৃতিকে সামনে আনে। অন্যদিকে শান্তির পায়রা বহন করছে সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও বৈশ্বিক শান্তির বার্তা।

মোটিফগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ ঢাকা পোস্টকে বলেন, “এবারের শোভাযাত্রার পাঁচটি প্রধান মোটিফ প্রতীকীভাবে নতুন সূচনা, ঐতিহ্য ও সামাজিক প্রত্যাশাকে একসূত্রে গেঁথেছে। মোরগ নতুন ভোরের ডাক ও নবজাগরণের প্রতীক। অতীতের গ্লানি পেছনে ফেলে নতুন আলো ও সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানোর বার্তা দেয় এটি।”

তিনি আরও বলেন, “দোতারা আমাদের লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতিচ্ছবি। ঘোড়া ও কাঠের হাতি প্রাচীন লোকঐতিহ্য ও আনন্দের প্রতীক। শান্তির পায়রা বৈশ্বিক ও জাতীয় অস্থিরতার মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের প্রত্যাশা প্রকাশ করে।”

সকাল ৯টায় শুরু হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’

নববর্ষ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৈশাখী শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু হবে। সকাল ৮টা থেকে চলবে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। শোভাযাত্রাটি শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নিয়ে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি হয়ে আবার চারুকলা অনুষদে ফিরে এসে শেষ হবে।

শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা শুধু নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। শোভাযাত্রা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রবেশপথ ও সংলগ্ন সড়ক বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশনা

পয়লা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরে প্রবেশ করা যাবে না এবং ব্যাগ বহনও নিষিদ্ধ থাকবে। তবে চারুকলা অনুষদে প্রস্তুত করা মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। শোভাযাত্রায় ইংরেজি প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি বেলুন, ফেস্টুন ও আতশবাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি না করারও অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে সব অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। ওই দিন বিকেল ৫টার পর আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবে না। নববর্ষের দিন সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসকারীরা নিজেদের গাড়ি চলাচলের জন্য শুধু নীলক্ষেত মোড়সংলগ্ন গেট ও পলাশী মোড়সংলগ্ন গেট ব্যবহার করতে পারবেন।

ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠসংলগ্ন এলাকা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের আশপাশ, দোয়েল চত্বরসংলগ্ন এলাকা এবং কার্জন হল এলাকায় স্থাপন করা হবে মোবাইল পাবলিক টয়লেট।

নিরাপত্তা জোরদারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপন এবং সেগুলোর সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের অনুরোধ জানিয়েছে।

থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজনও

নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে চৈত্র সংক্রান্তির বিকেলে চারুকলা অনুষদে থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজন। ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় লোকসংগীত, নৃত্য ও শিল্পচর্চার বিভিন্ন ধারার পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া ১৫ ও ১৬ এপ্রিল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ‘প্রত্যয় বাংলাদেশ’-এর পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হবে ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’ শীর্ষক যাত্রাপালা।

এসএআর/এসএম