এবার উপবৃত্তির টাকা মিলবে সহজে, স্বস্তিতে অভিভাবকরা

Dhaka Post Desk

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর

১৭ মে ২০২২, ০৯:৪৪ পিএম


এবার উপবৃত্তির টাকা মিলবে সহজে, স্বস্তিতে অভিভাবকরা

আমার মেয়েকে সরকারের দেওয়া উপবৃত্তির টাকা গ্রহণে এখন আর কষ্ট হবে না। আগে শিওর ক্যাশ ছাড়া উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করা যেত না। আর এখন পছন্দের যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করা যাবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমার মতো হাজারো অভিভাবক সুবিধাজনক মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা গ্রহণ ও উত্তোলন করতে পারবেন। এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

কথাগুলো বলছিলেন আশরাফুল ইসলাম। তিনি রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর ইউনিয়নের পানবাজার বাইশারপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং হরিদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আর্নিকা খাতুনের বাবা। সরকারের দেওয়া উপবৃত্তির টাকা গ্রহণে বিগত দিনে নানা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন আশরাফুল। তবে এখন আর এই বিড়ম্বনা হবে না জেনে ভীষণ আনন্দিত তিনি।

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানে মোবাইল ব্যাংকিং খাত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এতে দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মা, বাবা ও বৈধ অভিভাবক নিজেদের পছন্দমতো সুবিধাজনক মোবাইল ব্যাংক হিসাবে টাকা গ্রহণ ও উত্তোলন করতে পারবেন।  

রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন এই নির্দেশনা প্রাপ্তির বিষয়টি জানিয়েছে। অধিদপ্তরের উপজেলা পর্যায়ে সেই মোতাবেক নতুন করে নাম তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

জানা গেছে, অর্থ বিভাগের জিটুপি পেমেন্ট পদ্ধতির সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সমন্বিত ডিজিটাল পদ্ধতির সমন্বয় সাধন করে উপবৃত্তি বিতরণ করা হবে। এর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুধু শিওর ক্যাশের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল। পরে শিওর ক্যাশের পরিবর্তে নগদ এ সেবায় যুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা নিজেদের হাতে থাকা অথবা পছন্দের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করতে পারছিলেন না। তাদের নতুন হিসাব খুলতে হতো। এর ফলে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা পাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ জন্য কোন সেবার মাধ্যমে অভিভাবকেরা উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করবেন, তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সরকারের নতুন এ নির্দেশনায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি গোসাইগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবিনা আক্তার জানান, স্কুল থেকে নতুন করে তাদের সবাইকে আবেদন করতে বলা হয়েছিল। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নির্দেশনা অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধনের সনদ দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করেছে। এখন যে যার মতো পছন্দের মোবাইল ব্যাংক হিসাবে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ ও উত্তোলন করতে পারবে।

রংপুর নগরীর তোজাম্মেল হোসেন মেমোরিয়াল শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া আক্তারের কাছে জানতে চাইলে সেও একই কথা বলে। সেনপাড়া সিটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিম মুরশেদ জানান, গত বছরের ডিসেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর উপবৃত্তির টাকা পায়নি তারা। বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের বিদ্যালয়ে নতুন করে তালিকা করা হয়েছে। যেকোনো মোবাইল ব্যাংক হিসাবে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে যুগোপযোগী হয়েছে বলেও জানান এই শিক্ষার্থী।

প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপবৃত্তির টাকা পাওয়ার জন্য আগে যে মোবাইল ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়েছে, সেটি ব্যবহারে প্রত্যন্ত এলাকার অভিভাবকরা অভ্যস্ত ছিলেন না। এতে করে অর্থ লেনদেনের জন্য স্থানীয় বাজারের এজেন্টদের কাছে যেতে হতো। অনেকের ক্ষেত্রে টাকা প্রাপ্তির পিন নম্বর নিয়ে সমস্যা হয়েছে। ফলে অনেকের সন্তানরা উপবৃত্তির টাকা পেলেও উত্তোলন করতে পারতেন না। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে টাকা মোবাইল হিসাবে আসার পরও তারা অজ্ঞতার কারণে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কেইউপি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদুজ্জামান আহমেদ বলেন, আগে অনেক অভিভাবক মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারে অনভিজ্ঞ হওয়ায় বিড়ম্বনার শিকার হতেন। তবে এখন নতুন নির্দেশনা এসেছে। যেকোনো মোবাইল হিসাবে উপবৃত্তির টাকা প্রদান করা যাবে। এ জন্য আমরা নতুন করে তালিকা করছি। 

রংপুর নগরীর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক বলেন, ইএফটি এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। আমার স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী বাদ দিয়ে এখন পর্যন্ত ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন সনদ যাচাই করে ইএফটির জন্য আবেদন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইএফটির মাধ্যমে মোবাইলে টাকা দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাহজাহান সিদ্দিক বলেন, এখন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ অভিভাবকদের মোবাইল হিসাব সঠিকভাবে নিবন্ধন করা। যাতে ভুল হিসাবে টাকা না যায়, সেজন্য আগামী ২৩ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলো থেকে উপজেলা পর্যায়ে তালিকা সংগ্রহ করা হবে।
 
প্রসঙ্গত, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমাতে এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ধরে রাখার জন্য ১৯৯৯ সালে উপবৃত্তি চালু করে সরকার। এখন ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দিচ্ছে সরকার।

নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাক প্রাথমিকে প্রতি শিক্ষার্থী মাসিক ৭৫ টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া কোনো পরিবারের একজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি প্রাপ্য হলে মাসিক ১৫০ টাকা ও দুইজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি প্রাপ্য হলে মাসিক ৩০০ টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। এ ছাড়া ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণির কোনো পরিবারের একজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি প্রাপ্য হলে মাসিক ২০০ টাকা ও দুইজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি প্রাপ্য হলে মাসিক ৪০০ টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। 

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরআই

Link copied