হাঁড়িভাঙা আমে বাগানে হাসি, হাটে দুর্ভোগ

Dhaka Post Desk

ফরহাদুজ্জামান ফারুক, রংপুর

১৬ জুন ২০২২, ০১:৫৯ পিএম


রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের সরকারপাড়ার মোস্তনা বেগম। পাঁচ বছর ধরে হাঁড়িভাঙা আমের ব্যবসা করছেন। এই নারী তার স্বামী-সন্তান সামলে দিব্যি বাগানে সময়ও দিচ্ছেন। কারণ আমকে ঘিরেই তার সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। আম বাগানে মোস্তনা হাসলেও হাটে যাওয়ার প্রধান সড়কটির বেহাল দশায় মন খারাপ তার। দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে বাগানে থেকেই বিক্রি করছেন আম।  

অভাব-অনটন দূরে ঠেলে এই নারীর মতো হাজারো নারী-পুরুষের ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার নাম হাঁড়িভাঙা আম। বিষমুক্ত আঁশহীন রসালো এ আমের চাষ করে অনেকেই বদলে ফেলেছেন ভাগ্য। তবে আশার আলো দেখানো হাঁড়িভাঙার এবার ফলন কম হয়েছে। তবে আমের বাজার চড়া থাকার ইঙ্গিত মিলছে শুরুতেই।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) সকালে হাঁড়িভাঙা আমের জন্য প্রসিদ্ধ রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়ন ঘুরে এমনটা জানা গেছে। সরকারপাড়ায় সাতাশ বছর বয়সী মোস্তনা বেগমের সঙ্গে আম-বাগানে কথা হয়। ভালো দাম পাওয়ার আশায় মুখিয়ে থাকা এই নারীর চোখে-মুখে তখন খুশির ঝিলিক। বাগান থেকে আম বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।

Dhaka post

আম-বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত মোস্তনা বেগম ঢাকা পোস্টকে জানান, কয়েক বছর ধরে বাগান কিনে আমের ব্যবসা করছেন তিনি। তাকে এ কাজে সহযোগিতা করছেন তার স্বামী শফিউল ইসলাম। চলতি মৌসুমে বাড়ির পাশে ৩ লাখ টাকায় ২০০টি হাঁড়িভাঙা আমের গাছ কিনেছেন। এখন পর্যন্ত পরিচর্যায় তার ব্যয় এক লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।

মোস্তনা আরও জানান, হাটের চেয়ে বাগানই ভালো। কাঁদাপানি মাড়িয়ে হাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে বাগানে বসেই ব্যবসা করছেন তিনি। আমের বিক্রিও ভালো হচ্ছে। বুধবার থেকে হাঁড়িভাঙা আম পাড়া মৌসুম শুরু হয়েছে। ওই দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাগানে বসেই প্রায় ১২ মণ আম বিক্রি করেছেন।

সাত দশক আগে খোড়াগাছের তেকানী গ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল হাঁড়িভাঙার গল্প। কলম করা একটি গাছের চারা থেকে এখন হাজার হাজার বাগান হয়েছে। দিন বদলের এই আমচাষি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মনে লেগেছে উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছের পদাগঞ্জ হাট ও বদরগঞ্জের শ্যামপুর হাট হয়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙাময়। সেখানকার হাট-বাজারে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। একই অবস্থা রংপুরের সিটি বাজার, লালবাগ, দর্শনা ও টার্মিনাল মসজিদ সংলগ্ন সড়কে।

Dhaka post

পদাগঞ্জ হাটে সকাল থেকেই আমের আমদানি শুরু হয়। বিকিকিনি চলতে থাকে রাত পর্যন্ত। এ সময় মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ফড়িয়াদের হাঁকডাকে ভরা থাকে হাঁড়িভাঙার রাজধানীখ্যাত পদাগঞ্জ। বৃহস্পতিবার সকালেও হাটভরা মানুষের ভিড় চোখে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের জন্য আম কিনতে আশপাশের এলাকারও অনেক মানুষ এসেছে। তবে এসব মানুষের মধ্যে অনেকেই আমের দামের চেয়ে দুর্ভোগ নিয়েই ক্ষুব্ধ বেশি। হাটের স্থান সংকট আর কাঁদাপানির বিড়ম্বনার কথা জানালেন সবাই।

পদাগঞ্জ হাটের পাশে দাঁড়িয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকা আমচাষি মেহেদী হাসান বলেন, রাস্তায় অনেক সমস্যা। হাটে কোনো সেড নেই। আমরা কোথায় বসে আম বিক্রি করব, এর কোনো ব্যবস্থা নেই। হাটে শুধু কাঁদাপানির ছড়াছড়ি। আমাদের অনেকেই রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আম বিক্রি করছে। অথচ এই পদাগঞ্জ হাট থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে।

রিপন মিয়া নামে আরেক আমচাষি ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাটের প্রধান সড়কটির যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। পাইকারদের আসতে খুব কষ্ট হয়। আমরা চাই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হোক। এই পদাগঞ্জের আম প্রধানমন্ত্রী বিদেশে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এই আম যদি বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি করার ব্যবস্থা করা হয়, আমরা লাভবান হবো।

Dhaka post

হাটের পাশের গ্রাম উত্তরপাড়ার আমচাষি ছাইফুল ইসলাম বলেন, এখানকার কম-বেশি সবাই আমের চাষ করি। কিন্তু আম যে হাটে তুলব, সেই ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন হয়নি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপি কেউই এই হাট নিয়ে ভাবেন না। বর্ষার সময় আম নিয়ে আমরা খুব সমস্যায় থাকি। এখানকার মাটি এঁটেল, খুব পিচ্ছিল। একটু বৃষ্টি হলে হাঁটাহাঁটি করা কষ্টকর।

নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার নিয়ে পদাগঞ্জ হাটে এসেছেন মঈনুল ইসলাম। হাট ও বিভিন্ন বাগান ঘুরে দশ মণ হাঁড়িভাঙা আম কিনেছেন তিনি। ঢাকা পোস্টকে মঈনুল বলেন, আমের দাম ভালো, আমও ভালো। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না। রাস্তাঘাট ও হাটে কাঁদার কারণে চলাচল করা মুশকিল। এখানে গাড়ি রাখার তেমন ব্যবস্থাও নেই।

হাটে যাওয়ার রাস্তার দুপাশ থেকে শুরু করে পুরো হাট এলাকায় চলছে হাঁড়িভাঙার বিকিকিনি। প্রকারভেদে দাম চাইছেন আম চাষি, মৌসুমে ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকরা। এবার প্রকারভেদে পাকা আমের মণ ১২০০-১৪০০, কাঁচা-পাকা আমের দাম ১৫০০-১৮০০ আর কাঁচা আমের দাম ছিল ১৮০০-২২০০ টাকা। ক্রেতাদের বেশি দামের অভিযোগ আর বিক্রেতাদের কম সরবরাহের অজুহাত ছিল যথারীতি।

Dhaka post

আম-ব্যবসায়ী মানিক মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমের আমদানি একটু কম। আর কয়েকদিন গেলে আমদানি বাড়বে। এবার আমের দামও বেশি হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় পাইকার ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা হাটে এসেছেন। সারাদিন হাটে আম কেনাবেচা চলছে।

পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মহুবুল ইসলাম জানান, এবার আমের ফলন কম হয়েছে। কিন্তু যা উৎপাদন হয়েছে, তাতে আমরা খুশি। এবার চাষিরা লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে ভালো দাম উঠেছে। বড় আকারের আম (কাঁচা) বাজারে প্রতি মণ ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারিটা ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রংপুর নগরীর বড়বাড়ি এলাকা থেকে আসা হারুন, সুমন ও মিলন আম কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাটে আমের আকারভেদে দরদাম করতে হচ্ছে। এখানে অন্যান্য জায়গার তুলনায় আমের আমদানি অনেক বেশি এবং দাম একটু হলেও কম। বড় সাইজের আম ১৮০০-২২০০ টাকা, মাঝারিটা ১৪০০-১৮০০ টাকা আর একেবারে ছোট সাইজেরটা হাজারের কাছাকাছি। তারা তিনজন মিলে হাটের পাশের একটি বাগান থেকে চার মণ আম কিনেছেন।

Dhaka post

হাঁড়িভাঙা আমের বৈশিষ্ট্য হলো- এটি আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই আমের আঁটিও খুব ছোট, ছাল পাতলা। প্রতিটি আমের ওজন হয় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। মৌসুমের শুরুতে হাঁড়িভাঙার চাহিদা বেশি থাকায় এর দাম কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি হাঁড়িভাঙা আকারভেদে বাজারে খুচরা ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

আমচাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি সম্প্রাসারণ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে হাঁড়িভাঙা দেশের গণ্ডি পেরিয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হাঁড়িভাঙা আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে এবারও বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এ বছর ১৫০ কোটি টাকার ওপরে আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য জেলার আম যখন শেষ পর্যায়ে, তখনই হাঁড়িভাঙা আম বাজারে আসতে শুরু হয়। এই আম প্রায় দেড় মাস বাজারে পাওয়া যাবে।

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাহীন আহমেদ জানান, ক্রেতাদের কাছে আম পৌঁছে দিতে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে হাঁড়িভাঙা আমের সেলফলাইফটা কম হওয়াতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কীভাবে হাঁড়িভাঙা আমের সেলফলাইফটা বাড়ানো যায়, এ নিয়ে কৃষি বিভাগ ও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছে। রপ্তানির বিষয়টি নিয়েও আমরা কাজ করছি। কেউ যদি রপ্তানি করতে চায়, আমরা তাকে সহযোগিতা করব।

Dhaka post

এ বছর ৬১৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ কম হয়েছে জানিয়ে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, আমরা শুরু থেকেই হাঁড়িভাঙা আমের মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হরমোন প্রয়োগকে নিরুৎসাহিত করে আসছি। তারপরও গোপনে অনেক চাষি মাত্রা অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহার করেছেন। জেলায় ১ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন কম হলেও হেক্টর প্রতি ১২-১৫ টন আম আসবে। গত বছর ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছিল।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, আমের সবচেয়ে বড় হাট পদাগঞ্জে। সেখানে হাট সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। কিছু কিছু কাজ চলমান আছে। এছাড়া হাঁড়িভাঙা আম দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে পরিবহন সুবিধাসহ নিরাপত্তার বিষয়টিও জোরদার করা হয়েছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তারা এবার আম চাষ করেছে। তাদের উৎপাদিত আম আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয়েরও সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

এসপি

Link copied