অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাই, এখন কাজ নেই খাবারও নেই

Dhaka Post Desk

জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ 

২২ জুন ২০২২, ০১:৩৯ পিএম


অডিও শুনুন

সিরাজগঞ্জে গত দুই সপ্তাহ ধরে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে যমুনা নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে একদিকে যমুনা নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে সিরাজগঞ্জের দুটি পয়েন্টেই যেমন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তেমনি মানবেতর হতে শুরু করেছে বানভাসিদের জীবন-জীবিকা। ইতোমধ্যে জেলায় শুরু করা হয়েছে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম।  তবে বেশিরভাগ মানুষই এখনো এর আওতার বাইরে।

পানিবৃদ্ধির ফলে প্রতিদিনই নদীপাড়ের নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। ফলে এলাকার অনেকেই উঁচু বাঁধ বা নির্মাণাধীন ভবনে ঠাঁই নিচ্ছেন, পার করছেন মানবেতর জীবন। অনেকেই আবার রাস্তার ধারে নির্মাণ করার চেষ্টা করছেন অস্থায়ী ছাপরা ঘর। তবে জেলার চৌহালী উপজেলা ছাড়া এসব এলাকায় এখনো মেলেনি কোনো ত্রাণ বা শুকনো খাবার। 

সরেজমিনে সদর উপজেলার খোঁকশাবাড়ী ইউনিয়নের গুনেরগাতী, চকখোঁকশাবাড়ি ও পাঁচিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গবাদিপশু ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে ওয়াপদা, বাঁধ ও নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন মানুষ। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়ি বা উঁচু স্থানে। তবে নিজেরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটালেও শিশুসন্তান ও গবাদিপশুর খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। শুকনো জ্বালানি কাঠের অভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। খোলা আকাশের নিচে খর দিয়ে কোনোমতে রান্না করছেন অনেকেই। এতে বিপদে পড়েছেন বানভাসি এই মানুষ।

dhakapost

খোঁকশাবাড়ির নিম্নাঞ্চলের বন্যা কবলিত গুনেরগাতী এলাকার বৃদ্ধ কোরবান আলী (৬৫) ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রায় ১৫ দিন হলো বাড়িসহ চারপাশে পানি উঠে তলিয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে গলাপানি। কোনো জিনিসপত্র বের করতে পারি নাই। কয়েকটা টিন খুলে এনে ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ। স্বল্পতা দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের। তবে খোঁজ নিচ্ছেন না কেউ। পরিবারের ৪ সদস্য নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।

চকখোঁকশাবাড়ি এলাকার জরিনা খাতুন, রমজান আলী ও সাইফুল ইসলামসহ অন্তত প্রায় ৩০ জন বন্যায় বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় খোকশাবাড়ির মাদ্রাসামাঠে টিনের ছাউনি ও পলিথিন দিয়ে বেড়া দিয়ে তৈরি করেছেন অস্থায়ী ছাপরা ঘর। বলছেন ঘরে খাবার না থাকলেও কেউ খোঁজ নিচ্ছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বললে বরাদ্দ পেলেই সহায়তা দেওয়া হবে মর্মে আশ্বস্ত করছেন।

মৃত হালিমের স্ত্রী জরিনা খাতুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৪-৫ দিন হলো বাড়িঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় এখানে কয়েকটি টিন ও পিলিথিন দিয়ে ছাপরা ঘর বানিয়েছি। কোনোরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও খাবার মিলছে না। স্বামী না থাকায় আমি নিজেই অনেকের বাড়িতে কাজ করে খাই। এখন সেই কাজ নাই, খাওয়াও নাই।

মৃত কালু শেখের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৬২) বলেন, শুকনো খাবার, মুড়ি-কাঁঠাল খেয়ে দিন পার করছি। আদৌ সরকারি কোনো সহায়তা পাব কি না জানি না।

dhakapost

খোঁকশাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদুল হাসান মোল্লা বলেন, বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দুর্গতদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা শেষে তাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হবে। সবসময় তাদের খোজঁ-খবর নেওয়া হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হবে এটা বলা যাচ্ছে না।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশুকাতে রাব্বি বলেন, বানভাসি মানুষের কষ্ট নিরসনে ইউপি চেয়ারম্যানদের নিয়ে সভা করেছি। চেয়ারম্যানরা আপডেট জানিয়েছেন সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ত্রাণের বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দিয়েছি। শুনেছি ইতোমধ্যেই জেলা ত্রাণ অফিস বরাদ্দ দিতে শুরু করেছে। 

এদিকে পানি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, যমুনা নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আরও অন্তত তিন দিন। চৌহালী ও শাহজাদপুরের ভাঙন রোধে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতেও পানি বাড়ছে। এতে ধীরে ধীরে প্লাবিত হচ্ছে যমুনার চর ও নিম্নাঞ্চল।

সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা আজ ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছি। চৌহালী উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হয়েছে। এখন সবজায়গাতেই বিতরণ করা হবে। কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর এই ৫ উপজেলায় ইতোমধ্যেই ১৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছি। চৌহালীর জন্য ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের খাদ্যসহ অন্যান্য শুকনো খাবার মজুত আছে।

তিনি আরও জানান, বন্যার্তদের জন্য ৯১১ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২০ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪০ মেট্রিক টন চাল, ৬ লাখ টাকা ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ শুরু করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, বানভাসি মানুষের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ও সব ইউএনওগণ নিয়মিত তাদের খোঁজ-খবর রাখছেন। 

প্রসঙ্গত, আজ (২২ জুন) সকাল ৬টায় জেলার কাজিপুর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় আরও ১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

শুভ কুমার ঘোষ/আরআই

টাইমলাইন

Link copied