বিরল গ্রুপের রক্তের জন্য কুমকুম খানই ভরসা

Dhaka Post Desk

মো. সাইফুল ইসলাম মিরাজ, বরগুনা

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:৫৯

সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর মাত্র সাত মাসের মাথায় একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান প্রসব করেন ঢাকার আফতাবনগর এলাকার বাসিন্দা শাহিনা আক্তার কুমকুম (৩৭)। একে তো অপ্রাপ্ত বয়সে জন্ম দেন, তার ওপর দুর্লভ গ্রুপের রক্তধারী এই মেয়েকে বাঁচাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল জাহিদ-কুমকুম দম্পতির।

জন্মের পরপরই একমাত্র মেয়ে সাফরিনার জন্য বি নেগেটিভ রক্তের জোগান দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয়েছে তাদের। তার জীবন বাঁচাতে দুর্লভ গ্রুপের এই রক্ত সংগ্রহ করেন অনেক কষ্টে। কুমকুম খান তখনই বুঝেছিলেন প্রিয়জনের কিংবা প্রিয় স্বজনদের জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা।

সন্তানের জন্য রক্ত সংগ্রহের অভিজ্ঞতা থেকে এই কাজে নেমে পড়েন শাহিনা আক্তার কুমকুম। ব্যবসায়ী স্বামী ইকবাল খান জাহিদের সহযোগিতা আর অনুপ্রেরণা নিয়ে ছোট চার সন্তানের দেখাশোনা আর গৃহস্থালির কাজের ফাঁকেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে রক্ত সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন কুমকুম।

বিভিন্ন মাধ্যমে মুমূর্ষু রোগীদের রক্তের প্রয়োজনীয়তার তথ্য সংগ্রহ করে নিজের তৈরি করা ফেসবুক পেজ ‘আমরা রক্তসন্ধানী - We Are Inquisitive Of Blood’ গ্রুপে পোস্ট করে রক্ত সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালে একক প্রচেষ্টায় শুরুর পর সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হন। এরপর এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাশিন ফাউন্ডেশন’।

দিন যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ‘রক্তবন্ধু’ কুমকুম খানের প্রয়োজনীয়তা। কদর বেড়েছে রক্তের প্রয়োজনে মুমূর্ষু রোগী ও তার স্বজনদের কাছে। গুরুত্বসহকারে প্রতি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করায় দ্রুত তার পরিচিতও ছড়িয়েছে বেশ! ফলে তার কাছে বাড়ছে রক্ত সংগ্রহের অনুরোধও। তার এই মানবিক কাজের জন্য রোগী ও তার স্বজনদের আস্থাও বেড়েছে তার ওপর। এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন তিনি।

রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে আমরা রক্ত সন্ধানীর উদ্যোগে
রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে আমরা রক্ত সন্ধানীর উদ্যোগে

দিনে এক ব্যাগ, দুই ব্যাগ থেকে এখন তার কাছে প্রতিদিন রক্ত প্রয়োজনের অনুরোধ আসে ৮০ থেকে ৯০ ব্যাগ। এত চাপ একা সামলাতে না পেরে তিনি সাহায্য নেন স্বেচ্ছাসেবীর। দেড় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী এখন কাজ করেন তার সঙ্গে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন শুধু রক্ত সংগ্রহের মধ্যেই মানবিকতা সীমাবদ্ধ রাখেননি কুমকুম খান। নতুন নতুন রক্তদাতা সংগ্রহের পাশাপাশি স্বামী ও শুভাকাঙ্ক্ষিদের সহযোগিতা নিয়ে অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের পাশেও দাঁড়ানো শুরু করেছেন তিনি। তাই পুরোনো সংগঠন রাশিন ফাউন্ডেশনকে নতুন রূপে সাজিয়েছেন সন্ধানী হিউম্যান এইড ফাউন্ডেশন নামে। এই ফাউন্ডেশনেরই অঙ্গসংগঠন ‘আমরা রক্তসন্ধানী - We Are Inquisitive Of Blood’। ৬৫ হাজারেরও অধিক নিয়মিত রক্তদাতার তথ্য সংগ্রহে আছে কুমকুম খানের কাছে। তার কাছে আসা রক্তের প্রয়োজনের অনুরোধের ৯০ ভাগই তিনি সহযোগীদের নিয়ে সমাধান করেন।

করোনার এই মহামারির মধ্যে রক্তদাতা সংগ্রহে একটু বেগ পেতে হলেও থেমে থাকেননি কুমকুম খান। রক্তদাতাদের নিরাপদ বাহনে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

শাহিনা আক্তার কুমকুম বলেন, একজনের শরীর থেকে যে আরেকজনের শরীরে রক্ত দেওয়া যায়, আমার মেয়ের জন্মের আগ পর্যন্ত এটাই আমার জানাই ছিল না। আমার মেয়ের জন্যই আমি এ বিষয়ে জানতে পারি। এরপর ফেসবুককে রক্তদাতা ও গৃহীতা সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। করোনার আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে আমারা প্রায় ১১০০ জন রক্তদাতা সংগ্রহ করে দিয়েছি। কিন্তু করোনার কারণে এর পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এখন রক্তদাতা পাচ্ছি প্রতি মাসে ৭০০ জনের মতো।

আমার কাছে তথ্য থাকা রক্তদাতার বড় একটি অংশ হচ্ছে শিক্ষার্থী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী রক্তদাতা দিতে এখন একটু সমস্যা হচ্ছে আমাদের। তিনি বলেন, আমার কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ রক্তদাতার এই তালিকা এতদিন আমি খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতাম, যা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে একটি ওয়েবসাটে এসব রক্তদাতাদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছি।

কুমকুম খানের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন সালাহউদ্দিন আল ফারেসী। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, তিন বছর ধরে দেশের অধিকাংশ জেলাসহ ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের পাশাপাশি আমার নিয়মিত ক্যাম্পেইন করেছি প্রতিটি উৎসব ও অনুষ্ঠানস্থলে। ফলে সংগঠনের সদস্যদের নম্বর ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। এ ছাড়া আমাদের ফেসবুক গ্রুপ তো রয়েছেই। আমাদের মোবাইল ফোনসহ ফেসবুক গ্রুপে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রক্তের প্রয়োজনে অনুরোধ জানান।

তিনি আরও বলেন, রক্ত সংগ্রহ করে দিয়ে জীবন বাঁচানোর এ কার্যক্রম শুরু করেছেন কুমকুম আপা। আমরা শুধু তাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।

এ নেগেটিভ রক্তধারী দৈনিক কালের কণ্ঠের সহসম্পাদক মাহতাব হোসেন বলেন, কুমকুম আপার ডাকে সাড়া দিয়ে আমি এখন পর্যন্ত চারবার রক্ত ও একবার প্লাটিলেন দিয়েছি। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে একবার, শ্যামলীর একটি ক্লিনিকে একবার, পিজি হাসপাতালে দুবার এবং মীরপুর কালশীর একটি ক্লিনিকে রক্ত দিয়েছি একবার।

ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত এবি নেগেটিভ রক্তধারী ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, অসুস্থতার জন্য আমার মাঝেমধ্যে রক্ত গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু দুর্বল গ্রুপের এই রক্ত সহজে পাওয়া যায় না। রক্তের জন্য একবার আমার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়। কিন্তু কিছুতেই ডোনার খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে কুমকুম আপার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে একজন ডোনার ময়মনসিংহে পাঠান। পরে ওই রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করি আমি।

রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে আমরা রক্ত সন্ধানীর উদ্যোগে
রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে আমরা রক্ত সন্ধানীর উদ্যোগে

যশোরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার সাত বছরের নাতনি ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত। ওর রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ। অসুস্থতার জন্য মাঝেমধ্যে ওকে রক্ত দিতে হয়। কিন্তু এই দুর্লভ গ্রুপের রক্ত সহজে পাওয়া যায় না। বেশ কিছুদিন আগে খুব জরুরি আমার নাতনির জন্য রক্ত দরকার হয়। কোনোভাবেই রক্ত সংগ্রহ করতে না পেরে কুমকুম আপার শরণাপন্ন হই। এরপর তিনি রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। এভাবে তিনি আমাকে তিনবার রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন।

সন্ধানী হিউম্যান এইড ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি এবং কুমকুম খানের স্বামী ইকবাল খান জাহিদ বলেন, আমার সহধর্মিণী ঘরে বসে মানুষের জীবন বাঁচাতে যে কাজটি করে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটা আমার জন্য গৌরবের। তার এ মানবিক কাজটি যাতে আরও প্রসারিত হয়, এ জন্য আমি সময় শ্রম ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করি। আমার এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের মানবিক কাজে তাকে অনুপ্রাণিত করার জন্য আমি তাকে সব সময় উৎসাহিত করে যাব।

এ বিষয়ে আমরা রক্ত সন্ধানীর প্রধান উপদেষ্টা গোলাম রহমান দুর্জয় বলেন, স্বামী-সন্তানের দেখাশোনার পাশাপাশি ঘর-গেরস্তালির কাজ সামলে কুমকুম আপা রক্ত সংগ্রহের যে কাজটি করে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে বিরল। ইতোমধ্যেই তিনি মানবিকতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। তার এ মানবিকতায় আমরাও সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানুষের জীবন বাঁচানোর এই প্রচেষ্টায় কুমকুম খানকে সব ধরনের সহযোগিতা করে যাবেন বলেও জানান তিনি।

এনএ

Link copied