হবিগঞ্জ হাসপাতালের লিফটে আটকে পড়া ৮ ব্যক্তি ডিসির ফোনে উদ্ধার

Dhaka Post Desk

জেলা প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ

১৮ আগস্ট ২০২২, ০৯:৫৩ পিএম


হবিগঞ্জ হাসপাতালের লিফটে আটকে পড়া ৮ ব্যক্তি ডিসির ফোনে উদ্ধার

হাসপাতালের লিফটে আটকাপড়াদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ফোন পেয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুতের সংযোগ দেয়নি হবিগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। উল্টো হাসপাতালে সরেজমিনে এসে লিফটে আটকাপড়ার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি দল পাঠানো হয়েছে। পরে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে লিফটে আটকাপড়াদের উদ্ধার করা হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের লিফট দিয়ে নামার সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন লিফটে রোগীসহ ৭ জন অবস্থান করছিলেন।

তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন জিটিভি’র হবিগঞ্জ প্রতিনিধি মোহাম্মদ নূরউদ্দিন। উদ্ধার পেতে তিনি বিদ্যুৎ অফিস, জরুরী সেবা ৯৯৯, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পৌনে এক ঘণ্টা পর সেখান থেকে উদ্ধার হন। উদ্ধারের পর ঘটনাটি নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন।

সকাল ১০টায় লিফট দিয়ে নামার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে এক রোগীসহ আমরা ৭/৮ জন আটকা পড়ি। লিফটে ওঠার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় কয়েকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। লিফটের অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান জেনারেটরে তেল নেই। এরপর বিদ্যুৎ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ একাধিক কর্মকর্তাদের ফোন দেই। তারা রিসিভ করেননি। বাধ্য হয়ে জরুরি সেবা ৯৯৯ ফোন দিয়ে সহযোগিতা চাই। সেখান থেকে ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ফায়ার সার্ভিস একাধিকবার বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিলেও ৫ মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। 

একসময় বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করে জানান, তারা সরেজমিনে দেখার জন্য হাসপাতালে গিয়েছেন। ফিরে এসে বললে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া হবে। সবশেষে জেলা প্রশাসককে ফোন দেওয়ার পর তড়িৎগতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এবং আমরা উদ্ধার হই। এর মধ্যে লিফটে আটকে ৪৫ মিনিট চলে গেছে।

হবিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক শিমুল মো. রফি ঢাকাপোস্টকে বলেন, জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে ফোন পেয়েই বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা বরাবরের মতোই জরুরি ভিত্তিতে আমাদের ফোন রিসিভ করেনি।
  
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলে সবসময় দেরিতে রেসপন্স করে। ফোন ধরতে চায় না। এ কারণে আমরা জরুরি মুহূর্তে সমস্যার মুখোমুখি হই। এটা শুধু হবিগঞ্জে না, আমি যত জায়গায় কাজ করেছি, সব জায়গাতেই বিদ্যুৎ অফিসগুলোর একই অবস্থা।

তিনি আরও বলেন, বুধবার হবিগঞ্জে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে দুইজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের লোকজন গাফিলতি করেছেন। তারা দ্রুত রেসপন্স করলে প্রাণহানী এড়ানো যেত।

হবিগঞ্জ সদর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিদ্যুৎ অফিসকে ফোন দিয়েছি জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য। কিন্তু তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেনি। সরেজমিনে এসে আমাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে একজন সাব অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠিয়েছেন। বিদ্যুৎ অফিস চরম দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা হলে তার দায়-দায়িত্ব কার হতো?

হাসপাতালের জেনারেটরে তেল নেই কেন- এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. মুমিনুল ইসলাম জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাবার কারণে জেনারেটরের তেল শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া জেনারেটর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায়, এতে জ্বালানি বেশি লাগে। হাসপাতালে কর্মরত বিদ্যুতের টেকনিশিয়ান এই জেনারেটর রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম নন। পিডিবির পক্ষ থেকেই এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিকল্প ফিডার স্থাপনের জন্য পিডিবির কাছে আবেদন করা হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

কোনো মানুষ ফোন করলেই তো আমরা বিদ্যুৎ দিয়ে দিতে পারি না। সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে- জরুরী ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ কেন দেওয়া হলো না, ঢাকা পোস্টের এই প্রশ্নের জবাবে হবিগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডেও সাব অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম মুকুল এই উত্তর দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বহুবার ফোন করার পর হবিগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন সরদারের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়নি অভিযোগটি একেবারে অস্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন সরদার বলেন, আমি তো ফোন পেয়েই বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছি। তারপর হাসপাতালে আমাদের লোককে পাঠানো হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম মুকুল অভিযোগ করে বলেন, ফোন পেয়ে আমি ঘটনার সত্যতা জানার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে লিফটম্যানকে খুঁজে পাইনি। হাসপাতালের আরএমও অসহযোগিতা করেছেন। বলা যায় খারাপ আচরণই করেছেন।

সাব-অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলামকে অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. মমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের সাব-অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম সাহেবের কাছে নির্বাহী প্রকৌশলীর ফোন নম্বর চাইলে, তিনি নম্বর দেওয়া যাবে না বলে জানান। এ কারণে বাক-বিতণ্ডা হয়েছে। আমরা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলাম। লিফটে আটকাপড়াদের উদ্ধার করা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। দীর্ঘসময় আটকে থাকলে অক্সিজেন কমে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া আটকাপড়ারা আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।

ডা. মমিনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল থেকে ফোন করা হলে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিবর্তে তারা আমাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে হাসপাতালে এসেছেন। তারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহানের মন্তব্য জানার জন্য কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এমএএস

Link copied