কবরস্থানেই সময় কাটে ‘টিম খোরশেদের’

Dhaka Post Desk

রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৪৭ পিএম


কবরস্থানেই সময় কাটে ‘টিম খোরশেদের’

টিম খোরশেদের ক্লান্ত সদস্যরা

ওরা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হলেও উদ্যমে কোনো ঘাটতি নেই। মহামারি করোনাভাইরাসে কেড়ে নেওয়া জীবন ওদের কাছে বড় আপন। রক্তের বাঁধন না থাকলেও তারা পরম যত্নে আবার কখনও চোখের জলে বিদায় জানায় করেনায় মৃত মানুষকে। এ কারণেই মানুষ ওদের নাম দিয়েছে ‘ওরা লাশের স্বজন’।

করোনাভাইরাসের হটস্পট নারায়ণগঞ্জে মৃত্যুর মিছিল যত দীর্ঘ হচ্ছে, ওদের দায়িত্বও যেন ততটাই শক্তি জোগাচ্ছে। রমজানের মাসে রোজা রেখেই দিন কিংবা গভীর রাতেও চলে ওদের দাফন কার্যক্রম।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের ‘টিম খোরশেদ’ এর সদস্যরা হয়ে উঠেছে নিদান কালের পরম বন্ধু। 

জানা গেছে, চলতি মাসে করোনার ভয়াল থাবায় আবারও লন্ডভন্ড হচ্ছে বহু পরিবার। বিশেষ করে গত ১৫ দিনে নারায়ণগঞ্জে গড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে টিম খোরশেদের সদস্যরাই প্রতিদিন দাফন করছেন ৩ থেকে ৪টি মরদেহ। শুধু কবরস্থই নয়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লাশ সৎকারও করছেন এই টিমের সদস্যরা।

টিম খোরশেদের অন্যতম সমন্বয়ক আলী সাবাব টিপু জানান, বুধবার (১৪ এপ্রিল) প্রথম রমজানের সারাদিনে মোট ৪টি করোনায় মারা যাওয়া মরদেহ দাফন করেছি আমরা। এছাড়া চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৩টি করে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ দাফন করেছেন টিম খোরশেদের সদস্যরা।

তিনি আরও বলেন, এ কাজ করতে গিয়ে টিমের ৪ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে ও কাউন্সিলর খোরশেদের বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। টিমের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় দাফন কার্যক্রমে শেষপর্যন্ত কাউন্সিলরের ১৭ বছর বয়সী ছেলে নকিব খন্দকারও যোগ দিয়েছে।

আলী সাবাব টিপু জানান, আমাদের ফ্রি অক্সিজেন সাপোর্ট কার্যক্রমও চালু রয়েছে। আজ পর্যন্ত আমরা ৩০০ রোগীকে ফ্রি অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েছি।

এদিকে কথা হয় কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, বুধবার (১৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম খান শমরিতা হাসপাতালে করোনায় মারা যান। রাতে তার লাশ দাফন করে বিশ্রামও নিতে পারিনি। বৃহস্পতিবার ভোরে খবর পেলাম তার স্ত্রী সাগরিকাও করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন।

কাউন্সিলর খোরশেদ বলেন, দুপুরে তার লাশটিও দাফন করেছি। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই দম্পতির ২ সন্তান থাকেন বিদেশে আর এক সন্তানের পরিবারের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে? গত ১ বছরে ১৮৫টি লাশের দাফন-সৎকার করেছি। অথচ মানুষকে আর কী করে সচেতন করা যায়, সেটির কৌশল আমাদের জ্ঞানে নেই।

তিনি আরও বলেন, মহামারি করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন, তারা কী পরিমাণ কষ্ট ভোগ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন; তা দেখে আমরা নিজেরাই শিউরে উঠলেও হাজারো মানুষ এখনও করোনাকে সামান্য ভাইরাস হিসেবে নিচ্ছেন।

‘অনেক পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে রেখে আর কোনও খবরই নিচ্ছেন না। এমন ব্যক্তিদের পাশে আমাদের সদস্যরা রয়েছেন।’

এছাড়া মরদেহ দাফন-সৎকার, নিয়মিত প্লাজমা ডোনেশন, আক্রান্তদের টেলি-মেডিসিন সেবা প্রদান এবং এমনও পরিবার আছে যাদের সবাই আক্রান্ত, তাদের আহ্বানে ওষুধ নিয়ে আমাদের সদস্যরা সরবরাহ করে আসছেন। কষ্ট লাগে যখন দেখি বিধিনিষেধে এখনো মানুষ বের হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি জানান।

রাজু আহমেদ/এমএসআর

Link copied