জোড়াতালিতে চলছে সিলেটের রেলসেবা, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

সিলেটের রেল যোগাযোগের বর্তমান অবস্থা যাত্রীদের জন্য এক বাস্তব সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ সিলেট শহর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রা করেন। কিন্তু ট্রেনের দেরি, যাত্রী ভোগান্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জোড়াতালি দিয়ে রেল পরিচালনার কারণে রেলসেবা এখন যাত্রীদের আস্থা হারাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ট্রেন দুর্ঘটনা যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। উদয়ন এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুতি এবং শায়েস্তাগঞ্জে পারাবত এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনায় রেলের অব্যবস্থাপনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্রে জানা গেছে, সিলেট থেকে প্রতিদিন মোট ছয়টি ট্রেন ছেড়ে যায়। ঢাকাগামী চারটি ট্রেন হলো- কালনী এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেস। চট্টগ্রামগামী দুটি ট্রেন হলো- উদয়ন এক্সপ্রেস ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেস। একইভাবে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেও সমান সংখ্যক ট্রেন সিলেটে আসে।
রেলের আরেকটি সূত্র জানায়, সিলেট অঞ্চলের রেললাইন খারাপ থাকার অজুহাতে প্রতিটি ট্রেনের বগির সংখ্যা কমানো হয়েছে। সাধারণত দেশের ট্রেনে ১৬টির বেশি বগি থাকে, কিন্তু সিলেটে তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে রেলের ওপর চাপ কমে। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বগি যোগ করা হলেও তাতে ভাড়া বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, সিলেট থেকে ঢাকাগামী নন-এসি টিকিটের ভাড়া সাধারণত ৩৭৫ টাকা, কিন্তু অতিরিক্ত বগিতে তা বেড়ে হয় ৪৫০ টাকা। এ সময় এসি ভাড়া ৭১৯ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪০ টাকা পর্যন্ত হয়। ফলে যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে কর্মরত একটি বিশ্বস্ত সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে, সিলেটের রেলসেবা কার্যত নামমাত্র। এর মূল কারণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অবহেলা। সূত্রের দাবি, আমরা বাইরে এসব বলতে পারি না, চাকরি চলে যেতে পারে। অন্য রুটের মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও পরিত্যক্ত বগিগুলো সিলেটে পাঠানো হয় এবং সেগুলো দিয়েই যাত্রী পরিবহন করা হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালে কালনী এক্সপ্রেস নতুন ট্রেন হিসেবে সিলেটে এসেছিল। সেটির বয়স এখন প্রায় এক যুগ। ট্রেনের ইঞ্জিনগুলোও অবিশ্বস্ত। যদি অন্তত একটি রিজার্ভ ইঞ্জিন সিলেট স্টেশনে থাকত, এ সমস্যা অনেকটাই কমে যেত।
সূত্র আরও জানায়, প্রতিটি ট্রেন যাত্রার পর পরিষ্কারের জন্য ওয়াশব্লকে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে লোকবল সংকট থাকায় এ কাজে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। একই ইঞ্জিন দিয়েই বগিগুলো ওয়াশব্লকে নিয়ে যাওয়া ও ফেরত আনার কাজ করতে হয়। এর ফলে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন পৌঁছাতে দেরি হয় এবং অনেক সময় যাত্রাও বিলম্বিত হয়।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের খারাপ অবস্থার কারণে রেল যোগাযোগে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের অনেকাংশ রেলের দিকে চলে আসায় প্রতিদিন ট্রেনগুলো অতিরিক্ত ভার বহন করছে। এর ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেনগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে সিলেট রেলস্টেশনের যাত্রী আব্দুল ওয়াহিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, যদি সিলেট রেললাইন আধুনিকায়ন ও মেরামত করা হয়, তবে ট্রেনের গতি ও নিরাপত্তা অনেক উন্নত হবে। প্ল্যাটফর্মে দেরি কমবে, যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচও বাঁচবে। রেলকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে অবিলম্বে রেললাইন সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
অন্য এক যাত্রী মাসুম বিল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেলওয়ে বিভাগ সিলেটের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। প্রতিদিন যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছে, অথচ কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ট্রেনের দেরি, বগি সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়ার নামে আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন ছাড়া এই পরিস্থিতি সহ্য করা কঠিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট কল্যাণ সংস্থার কার্যকরী সভাপতি মোহাম্মদ এহসানুল হক তাহের ঢাকা পোস্টকে বলেন, সিলেটের রাজনীতিবিদরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন নন, তারা সিলেটপ্রেমীও নন। অন্য অঞ্চলের রাজনীতিবিদরা উন্নয়নের প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে একমত হন। কিন্তু আমাদের নেতারা একমত না হওয়ায় আমরা পিছিয়ে আছি। সিলেটের শাহজালাল এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সুবর্ণ এক্সপ্রেস নামে চলছে, অথচ এটি মূলত সিলেট-ঢাকা রুটের জন্য বরাদ্দ ছিল। যত দিন আমরা বিনিয়োগবিহীন প্রতিনিধি তৈরি করব, তত দিন উন্নয়নও হবে না।
সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে জানান, সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে আমরা কাজ করছি। যাত্রীদের দেরি, অন্যান্য সংকট ও রিজার্ভ ইঞ্জিন বরাদ্দের বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় বিভাগে জানিয়েছি। আশা করছি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দ্রুত অতিরিক্ত বগি ও রিজার্ভ ইঞ্জিন সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি কালোবাজারি রোধে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম একাধিকবার সিলেট রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে স্টেশনে বিশেষ কোচ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে, যাতে যাত্রীরা ছিনতাই বা অন্য কোনো অপরাধের শিকার না হন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, স্টেশনের পরিচ্ছন্নতা, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সার্বিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে মনিটর করা হচ্ছে। স্টেশনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং টিকিট বিক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত করা হবে।
মাসুদ আহমদ রনি/এআরবি