সাত বছরে সম্পদ বেড়েছে শহিদুলের, ৪০ মামলা থেকে খালাস

২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল—এই সাত বছরের মধ্যে ব্যবসা বেড়েছে ফরিদপুর-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুলের, পাশাপাশি সম্পদ বেড়েছে তার স্ত্রী নাজনীন রীনারও। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পরে ৮৫.৮ শতাংশ কৃষি জমি কিনেছেন শহিদুল। ৪০টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন গত দুই বছরে।
শহিদুল ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নগরকান্দা ও সালথা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই সময় ওই আসনে চূড়ান্তভাবে বিএনপির মনোনয়ন পান শামা ওবায়েদ। এ প্রেক্ষাপটে শহিদুল তার মনোনয়নপত্রটি প্রত্যাহার করে নেন।
তবে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সম্পদসহ আনুষঙ্গিক বিবরণ দিয়ে একটি হলফনামা জমা দিয়েছিলেন ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর। সাত বছর পর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ফরিদপুর-৪ আসনে প্রার্থী হিসেবে গত ২৮ ডিসেম্বর শহিদুল আরেকটি হলফনামা জমা দেন।
এ দুটি হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সাত বছরের ব্যবধানে ব্যবসা বাড়ছে শহিদুলের, পাশাপাশি সম্পদ বেড়েছে তার স্ত্রী নাজনীন রীনার।
২০১৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী শহিদুল মানিপ্লান্ট লিংক প্রাইভেট লি. এর পরিচালক ছিলেন। ২০২৫ সালের হলফনামায় ওই পরিচয়ের পাশাপাশি ফরিদপুর শহরের মুজিব সড়কে ইউনিসার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক দেখিয়েছেন।
২০১৮ সালের হলফনামায় শহিদুলের স্ত্রীর পরিচয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিজীবী পরিচয় দেওয়া হলেও তার নামে কোনো আয় উল্লেখ করেননি। ২০২৫ সালের হলফনামায় স্ত্রীর দুটি আয়ের খাত দেখিয়েছেন। এর মধ্যে চাকরি থেকে স্ত্রীর বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭২৪ টাকা এবং ব্যাংক মুনাফা থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৫ টাকা। এই দুই খাতে মোট আয় ১৩ লাখ ১ হাজার ৬৩৯ টাকা।
২০১৮ সাল থেকে আয় ও আয়ের খাতও বেড়েছে শহিদুল ইসলামের। ২০১৮ সালে তিনি ব্যবসা থেকে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেলেও ২০২৫ সালের হলফনামা অনুযায়ী পাঁচটি খাত থেকে বাৎসরিক ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৭৯৪ টাকা আয় করেছেন। এর মধ্যে ব্যবসা (পার্টনারশিপ ফার্ম) থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৩৫ টাকা, চাকরি থেকে ১৫ লাখ টাকা, ব্যাংকের মুনাফা থেকে ৮ হাজার ৫১২ টাকা, গাড়ি বিক্রি থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ক্যাশ ইনসেন্টিভ থেকে ১৫ হাজার ৪৪৭ টাকা। অর্থাৎ আয়ের খাতে গত সাত বছরে এই প্রার্থীর বাৎসরিক আয় বেড়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭৯৪ টাকা।
২০১৮ সালে শহিদুলের অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ৫৩ লাখ ২৯ হাজার ৫২১ টাকা। এর মধ্যে নগদ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল ২৫ লাখ ৮৯ হাজার ৫২১ টাকা। বন্ড, ঋণপত্র ও শেয়ারে বিনিয়োগ ছিল ১৫ লাখ টাকা। মোটরগাড়ি ছিল ১০ লাখ টাকার। স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ছিল ২০ হাজার টাকার। ইলেকট্রনিক সামগ্রী ছিল ১ লাখ টাকার। আসবাবপত্র ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকার।
২০২৫ সালে তার অস্থাবর সম্পত্তির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৫১ লাখ ২৮ হাজার ৪২২ টাকা, যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য তিনি দেখাননি। এর মধ্যে নগদ টাকা ১৫ হাজার ৭০২ টাকা, বন্ড, ঋণপত্র ও শেয়ারে বিনিয়োগ ১৫ লাখ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ৮ লাখ ৮২ হাজার ৭২০ টাকা। প্রাইভেটকার (অধিগ্রহণ মূল্য) ২৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
২০১৮ সালে শহিদুলের স্থাবর সম্পত্তি ছিল ৬২ শতাংশ কৃষি জমি, যার অর্জনকালীন মূল্য ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট থাকলেও তা ওয়ারিশ সূত্রে দেখিয়ে তার পরিমাণ এবং মূল্য দেখাননি।
২০২৫ সালে তার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৩৭৩ টাকার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি। কৃষি জমির পরিমাণ ১৭৯.৮৩ শতাংশ, যার মূল্য ৫৫ লাখ ২০ হাজার ৯১৭ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পরে কেনা ৩৩.৮৩ শতাংশ কৃষি জমির দাম দেখিয়েছেন ৫৬ লাখ ১ হাজার ৪৫৬ টাকা।
স্ত্রীর ২০১৮ সালে নিজ নামে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ছিল না। ২০২৫ সালে স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখ ২৪ হাজার ২৫৭ টাকার। এ খাতে ২১ ভরি সোনা দেখানো হলেও ‘মূল্য অজানা’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। হলফনামায় স্ত্রীর কোনো স্থাবর সম্পত্তি দেখানো হয়নি।
শহিদুল জমি কেনা বাবদ ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৩ টাকা ঋণ করেছেন, যা তিনি ব্যক্তিগত ধার হিসেবে দেখিয়েছেন।
মো. শহিদুল ইসলাম নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের কোনাগ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম খানের ছেলে। তিনি তার বর্তমান ঠিকানা দেখিয়েছেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তার বয়স ৫৪ বছর ৮ মাস ৯ দিন। তিনি ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন।
এই আসনে নির্বাচন করার জন্য ১০ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। গত ৩ জানুয়ারি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল হাসান মোল্লার কার্যালয়ে ৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ এবং ৫ জনের বাতিল ঘোষণা করেন। ওইদিন মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় শহিদুলের।
এ ছাড়া, ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সরোয়ার হোসাইন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির আতাউর রহমান কালু, জাতীয় পার্টির রায়হান জামিল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইসহাক চৌধুরী।
কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুলের নামে ৪০টি মামলা ছিল। এ মামলাগুলো হয়েছে ২০১০ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। মামলাগুলো থেকে তিনি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে খালাস পেয়েছেন বলে জানা গেছে তার পরিবেশিত হলফনামার তথ্য থেকে।
জহির হোসেন/এএমকে