হাড় কাঁপানো শীতে ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন

হাড় কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশায় যখন জনজীবন প্রায় স্থবির, তখন পিরোজপুর সদর উপজেলার সিআই পাড়ায় অন্যের জমিতে গড়ে ওঠা একটি জরাজীর্ণ টিনের ঝুপড়িতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন আলেয়া বেগম ও খালেক হাওলাদার দম্পতি। দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা ও তীব্র শীতের যন্ত্রণায় প্রতিদিনই নতুন করে দুর্ভোগ ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। এই বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা পেতে সরকারের কাছে একটি ঘরের দাবি জানিয়েছেন তারা।
খালেক হাওলাদার ও আলেয়া বেগম পিরোজপুর সদর উপজেলার সিআই পাড়া এলাকার বাসিন্দা। এই দম্পতির সংসারে ছিল দুই ছেলে। একজন প্রতিবন্ধী, যিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন। অন্যজন বহু বছর ধরে তাদের কোনো খোঁজ রাখেন না। সন্তান হারানোর বেদনা ও জীবনের চরম অনিশ্চয়তা একসঙ্গেই বয়ে বেড়াচ্ছেন আলেয়া ও খালেক।
সরেজমিনে সিআই পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিন পাশ ঘেরা ডোবার মাঝখানে নিচু জমিতে ছোট্ট একটি টিনের ঝুপড়ির ভাঙা চকিতে অসহায়ভাবে শুয়ে আছেন বৃদ্ধা আলেয়া বেগম। তার স্বামী খালেক হাওলাদার গেছেন রাস্তার পাশ থেকে কাগজ কুড়াতে। ঘরের ভেতরে রয়েছে কয়েকটি থালা-বাসন ও একটি পুরোনো চকি (খাট)। শীত নিবারণের জন্য আছে মাত্র কয়েকটি কাঁথা ও একটি জীর্ণ কম্বল। রাত নামলেই টিনের ফাঁক গলে হিমেল বাতাস ঢুকে পড়ে। শীত ঠেকাতে মশারির ওপর কাঁথা টানিয়ে কোনো রকমে রাত পার করার চেষ্টা করেন তারা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আলেয়া ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। দু-একটি কথা বলেন, তাও অস্পষ্ট।
আলেয়া বেগমের প্রতিবেশী হাসান মামুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, তারা খুবই গরিব মানুষ। রাস্তার পাশ থেকে কাগজ কুড়িয়ে সংসার চালান। তাদের দুই ছেলে ছিল—একজন মারা গেছেন, অন্যজন তাদের কোনো খোঁজ নেন না। সামান্য আয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কষ্টকর। তাদের থাকার ঘরটিও খুবই জরাজীর্ণ। এই তীব্র শীতে তাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। যেখানে ভাত জোগাড় করাই তাদের জন্য কঠিন, সেখানে ভালো ঘরে থেকে শীত নিবারণ করবেন কীভাবে?
আরেক প্রতিবেশী নার্গিস বেগম বলেন, জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রতিদিন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কাগজ, কাগজের কার্টন (বাক্স) ও প্লাস্টিক কুড়িয়ে সংগ্রহ করেন তারা। দিন শেষে সেগুলো বিক্রি করে যা পাওয়া যায়, তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। শীতের কারণে কাজ কমে যাওয়ায় এখন তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।
অস্পষ্ট কণ্ঠে আলেয়া বেগম বলেন, শীতে খুব কষ্ট হয়। রাতে ঘুম আসে না। সারা গায়ে ব্যথা ভরে যায়।
স্থানীয়রা জানান, শীত মৌসুমে এই দম্পতির মতো আরও অনেক অসহায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়লেও তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা খুবই সীমিত। নিয়মিত শীতবস্ত্র বা পুনর্বাসন সহায়তা না থাকায় তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশীদ বলেন, আপনাদের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে এখানে এসে যা দেখেছি, তাতে বোঝা যায় তারা দুজন এখানে বসবাস করছেন এবং মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের থাকার সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যা সমাধানে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে তারা একটি ভালো জায়গায় সুস্থভাবে বসবাস করতে পারেন। একই সঙ্গে শীত নিবারণের জন্য আমরা তাদের দুটি কম্বল দিয়েছি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতাও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হবে।
শাফিউল মিল্লাত/এআরবি