এক পায়ে ভর করেই চলছে বাছিরের জীবনযুদ্ধ

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই দক্ষিণ রাংচাপড়া গ্রামের সরু পথটিতে দেখা যায় এক পরিচিত দৃশ্য। এক ব্যক্তি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন হেঁটে নয়, এক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পথ পাড়ি দিচ্ছেন। প্রতিদিনের মতোই তার গন্তব্য রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান।
এই মানুষটির নাম বাছির কুমার (৩৮)। জন্ম থেকেই তার ডান পা নেই। ডান হাতও কবজি থেকে আঙুল পর্যন্ত নেই। শরীরের এমন সীমাবদ্ধতা অনেকে থেমে গেলেও বাছিরের জীবন থেমে থাকেনি। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার দক্ষিণ রাংচাপড়া গ্রামের এই মানুষটি এক পা আর এক হাত নিয়েই লড়ে যাচ্ছেন জীবনের সঙ্গে।
বাছির কুমারের জীবনে সংগ্রামের শুরুটা খুব ছোট বয়স থেকেই। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবা আব্দুল কুমার মারা যান। পরিবারের জন্য রেখে যান শুধু ভিটার সামান্য জমি। এরপর আট সন্তানের সংসার সামলানোর কঠিন দায়িত্ব পড়ে মা হাজেরা খাতুনের ওপর। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে সন্তানদের বড় করে তুলেছেন তিনি। ভাইবোনদের মধ্যে বাছিরই সবচেয়ে ছোট। অভাবের সংসারে ছোট ছেলে বাছিরও খুব দ্রুত বুঝে ফেলেছিলেন, জীবনে টিকে থাকতে হলে তাকে নিজেকেই লড়তে হবে। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল তার। তবুও নিজেকে কখনো পরিবারের বোঝা হতে দেননি।
মাত্র দশ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সঙ্গে একটি চায়ের দোকানে কাজ শুরু করেন বাছির। দোকানের ছোটখাটো কাজ করতে করতেই শিখে ফেলেন অনেক কিছু। এক হাতে চা বানানো, কাপ ধরা, গ্রাহকদের দেওয়া, সবকিছু ধীরে ধীরে তার অভ্যাস হয়ে যায়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির কাছে তা যেন তেমন বড় হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

কয়েক বছর পর নিজের সাহসেই ভালুকা–গফরগাঁও সড়কের পাশে দক্ষিণ রাংচাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটি ছোট চায়ের দোকান দেন তিনি। সেই দোকানই এখন তার জীবন। প্রায় ২২ বছর ধরে এক পা আর এক হাতে এই দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন বাছির। দোকানে বসে চা বানান, গ্রাহকদের সঙ্গে গল্প করেন, আবার দোকানের সব কাজই সামলান। স্থানীয় অনেকেই প্রতিদিন তার দোকানে আসেন। কেউ চায়ের জন্য, কেউ আবার তার সঙ্গে দুই কথা বলার জন্য।
জীবনের এই সংগ্রামের মাঝেই প্রায় ১৪ বছর আগে আকলিমা নামের এক নারীকে বিয়ে করেন বাছির। এখন তাদের সংসারে দুই ছেলে তানভীর (১২) ও রানা (১০)। দুজনেই স্কুলে পড়ে। চায়ের দোকান থেকেই যা আয় হয়, তাই দিয়ে চলে চারজনের সংসার। প্রতিদিন খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে তিন থেকে চারশ টাকার মতো। সেই আয়ে সংসার চালানো সহজ নয়। তবুও ছেলেদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
বাছিরের প্রতিদিনের যাতায়াতও কম কষ্টের নয়। বাড়ি থেকে দোকানের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই পথ তাকে পাড়ি দিতে হয় এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। তবুও তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই। শান্ত গলায় তিনি বলেন, ভিক্ষা করে বাঁচতে চাই না। যতদিন পারি নিজের কাজ করে সংসার চালাতে চাই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন মানিক বলেন, বাছির কুমার জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। কিন্তু তিনি কখনো ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেননি। নিজের পরিশ্রমে চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তার এই মানসিক শক্তি সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার।
ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মন্ডল বলেন, বাছির কুমার একজন সংগ্রামী মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আত্মনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা বিষয়টি জেনে খোঁজখবর নিচ্ছি এবং তার জন্য কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায় তা দেখব।
বাছির কুমারের জীবন যেন প্রতিদিনের এক নীরব সংগ্রামের গল্প। শরীরের সীমাবদ্ধতা তাকে থামাতে পারেনি। অভাবও তাকে হার মানাতে পারেনি। এক পা আর এক হাত নিয়েই তিনি প্রমাণ করে চলেছেন মানুষের শক্তি শুধু শরীরে নয়, ইচ্ছাশক্তিতেও থাকে।
আরকে