চুয়াডাঙ্গায় টানা ১৮ দিন নেই জলাতঙ্কের টিকা, মিলছে না ফার্মেসিতেও

চুয়াডাঙ্গায় টানা ১৮ দিন ধরে জলাতঙ্ক (র্যাবিস) প্রতিরোধী ভ্যাকসিন না থাকায় জেলার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি ফার্মেসি- কোথাও এই জীবনরক্ষাকারী টিকা মিলছে না। ফলে কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আহত রোগীরা চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যাদের প্রত্যেকেই এখন মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর হাসপাতালের র্যাবিস ভ্যাকসিনের মজুত সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নতুন করে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ আসেনি। কবে নাগাত আসবে সেটারও নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এতে জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতালের জরুরি জলাতঙ্ক প্রতিরোধ চিকিৎসা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত র্যাবিস ভ্যাকসিন বিতরণ কক্ষে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী রোগী ও তাদের স্বজনরা ভিড় করছেন। তবে ভ্যাকসিন না থাকায় চিকিৎসা না নিয়েই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী টিকা নিতে এসেছেন। কিন্তু হাসপাতাল ও ফার্মেসি—কোথাও ভ্যাকসিন না পেয়ে সবাইকে ফিরে যেতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই বলে জানা গেছে।
জেলার সিভিল সার্জন জানান, কুকুর, বিড়াল, শেয়াল বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো টিকা না দিলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। বর্তমানে যারা কামড়ের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমন পরিস্থিতিতে পোষা প্রাণীর মালিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো ছাড়া আপাতত অন্য কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগী ওসমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, সেখানে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেই এবং বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। কিন্তু শহরের একাধিক ফার্মেসিতে খোঁজ করেও তিনি কোথাও ভ্যাকসিন পাননি।
ওসমান বলেন, জলাতঙ্ক যে কতটা ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী রোগ, তা আমরা সবাই জানি। দ্রুত ভ্যাকসিন না পেলে জীবননাশের আশঙ্কা থাকে। অথচ হাসপাতালে এসেও চিকিৎসা পাচ্ছি না। আমরা চরম আতঙ্কে আছি। কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি—অবিলম্বে ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।
আরেক ভুক্তভোগী সিফাত ঢাকা পোস্টকে বলেন, কুকুরে কামড় দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চাইলেও সেখানে ভ্যাকসিন না থাকায় তাকে ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে বলা হয়। কিন্তু শহরের প্রায় সব ফার্মেসিতে ঘুরেও তিনি ভ্যাকসিনের সন্ধান পাননি।
সিফাত বলেন, ভ্যাকসিন না পেয়ে আমরা চরম দুর্ভোগে আছি। সময়মতো ভ্যাকসিন না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। এমন গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিনের এমন সংকট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে ফার্মেসি মালিকরাও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে হতাশা প্রকাশ করেছেন। শহরের এক ফার্মেসি দোকানদার ইসমাইল বলেন, প্রতিদিনই বহু মানুষ র্যাবিস ভ্যাকসিনের জন্য তার দোকানে আসছেন। কিন্তু চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কাউকেই ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে সেই কাঁচামালের সংকট থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
আরেক ফার্মেসি দোকানদার খালেদ মাসুদ বলেন, কয়েকদিন ধরে সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীরা ফার্মেসিগুলোতে ছুটে আসছেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে অনেক রোগী সন্দেহ করছেন, দোকানিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্যাকসিন আটকে রেখে সিন্ডিকেট করছে।
তিনি বলেন, অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবতা হলো—উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই বর্তমানে ভ্যাকসিন নেই। কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, কাঁচামাল সংকটের কারণে তারা চাহিদা অনুযায়ী ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারছে না। এমনকি অর্ডার দিলেও ভ্যাকসিন পেতে ১০ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস ঢাকা পোস্টকে বলেন, র্যাবিস বা জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মরণঘাতী রোগ, যা কুকুর, বিড়াল, শেয়াল ও বেজির মতো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে র্যাবিস ভ্যাকসিনের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সদর হাসপাতালে গত ২১ ডিসেম্বর ভ্যাকসিনের মজুত শেষ হয়ে গেছে। নিয়মিত চাহিদা পাঠানো হলেও আপাতত ভ্যাকসিন সরবরাহ সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।
এই গত ১৮ দিনে যেসব ব্যক্তি কুকুর, বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আহত হয়েছেন, তারা মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, জলাতঙ্কের টিকা সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সময়মতো না দিলে তারা অবশ্যই ঝুঁকিতে থাকেন। কামড় দিলেই জলাতঙ্ক হবে এমন নয়, তবে ঝুঁকি এড়াতে সময়মতো টিকা নেওয়াই একমাত্র উপায়।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু চুয়াডাঙ্গা নয়, দেশব্যাপীই র্যাবিস ভ্যাকসিন সংকট চলছে। সরকারি ও বেসরকারি—কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গাতেও আহতের সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সরকারিভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তারা বলছেন স্থানীয়ভাবে কিনতে অর্থাৎ বেসরকারি পর্যায়ে। আর বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, আপাতত তাদের ক্যাপাসিটি ছিল ২০-২৫ হাজার। এখন চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়ে লাখের ঘরে। এ কারণে প্রস্তুত করতে সময় লাগবে। হয়তো চলতি মাসেও সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কিনা নিশ্চয়তা নেই।
তিনি আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। যাদের কুকুর, বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তারা ইনফেকশন ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছেন। আর যাদের পোষা প্রাণী আছে, তাদের অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য সচেতন মহলের আশঙ্কা, জীবনরক্ষাকারী এই ভ্যাকসিনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চুয়াডাঙ্গায় জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আফজালুল হক/আরকে