রংপুরে আলুর ক্ষেতে মড়ক রোগের প্রকোপ, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

রংপুরে টানা কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে আলু ক্ষেতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ব্লাইট বা আলুর মড়ক রোগ। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোগে আক্রান্ত গাছের পাতায় কালচে দাগ ও ফোসকার মতো ক্ষত তৈরি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাতা শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কে আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ধরা হয়। বিশেষ করে নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়া এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
কৃষকদের ভাষ্য, আলুর চারা যখন সতেজ হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের প্রভাবে লেট ব্লাইট বা পাতামড়ক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্ত জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও তারা রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলু চাষি বিপ্লব হোসেন অপু জানান, তিনি এক একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। গত ৭ ডিসেম্বর তিনি স্টিক জাতের আলু রোপণ করেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ছত্রাকনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এবার আবহাওয়ার প্রভাবে ব্লাইটের পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে। ইউরিয়া সার ব্যবহারের কারণেও রোগটি আরও বিস্তার লাভ করেছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহ যদি এমন আবহাওয়া বিরাজ করে, তাহলে আলু চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। বিগত বছরগুলোতে আলু চাষে যে লোকসান হয়েছে, তা তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সামনে ফলন কমে গেলে আবারও লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি সেরুডাঙ্গা এলাকার কৃষক আবু বকর জানান, তার আলু ক্ষেতে উঠতি গাছগুলোর পাতার নিচে কালচে রং ধরেছে। ঘন কুয়াশা ও শীতের তীব্রতায় তিনি আলু ক্ষেত নিয়ে চিন্তিত। কৃষি অফিসের পরামর্শে রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কীটনাশক স্প্রে ব্যবহার করলেও আলুর উৎপাদন আশানুরূপ হবে কিনা, তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বগুড়াপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর আলু চাষে লোকসান হয়েছিল। এ বছর অল্প পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। কিন্তু শীতের সকালে আলু ক্ষেতে গিয়ে পোকা ধরা গাছ দেখলে মন ভেঙে যায়। এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এবারও আলুতে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, আলুর ব্লাইট বা মড়ক রোগ প্রতিরোধে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আগেই কৃষকদের সতর্ক করেছে। সম্প্রতি অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং থেকে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে লেট ব্লাইট রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। এ অবস্থায় ফসল সুরক্ষায় কৃষকদের আগাম করণীয় ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সতর্কবার্তায় আরও উল্লেখ করা হয়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আবহাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১২ হাজার ৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৭ হাজার ১০০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং নীলফামারীতে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আলুর মড়ক রোগ একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের কারণে আলু নষ্ট হওয়া, অতিরিক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগসহ বিভিন্ন কারণে প্রতি মৌসুমে সারাদেশে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তামান্না বেগম বলেন, আলুর মড়ক রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। রোদ কম থাকলে, অর্থাৎ বর্তমান আবহাওয়ায় আলুর পাতা গজানোর পর থেকে পাঁচ দিন পরপর ৪০ দিন পর্যন্ত ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে পচন রোধে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শীত ও কুয়াশার তীব্রতা বাড়লে আলু ক্ষেতে ঘন ঘন স্প্রে করতে হবে। তার লক্ষ্মীপুর ব্লকে এ বছর ২১০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবাদি জমির পরিমাণ কিছুটা কমেছে বলেও তিনি জানান।
আলুর ব্লাইট বা মড়ক রোগের লক্ষণ সম্পর্কে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা, হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়। পরে এসব দাগ দ্রুত কালো রং ধারণ করে এবং পাতা পচে যায়। সকালে মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়।
কৃষকদের করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাত দিন পরপর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে এবং গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। যদি ফসল ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে জমিতে সেচ বন্ধ করে চার থেকে পাঁচ দিন পরপর সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, আজ শুক্রবার সকাল ৬টায় রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার এ জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তিনি আরও জানান, শুক্রবার সকাল ছয়টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৯, নীলফামারীর ডিমলায় ৯, সৈয়দপুরে ৯ দশমিক ৪, দিনাজপুরে ৯ দশমিক ৮, ঠাকুরগাঁওয়ে ১০ এবং গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এআরবি