চাকরির পেছনে ছোটেননি, মাশরুম চাষে বদলে গেল জীবন

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার এক তরুণ দেখিয়ে দিয়েছেন চেষ্টা,পরিকল্পনা আর অধ্যবসায় থাকলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগও হতে পারে সফল ক্যারিয়ার। এই যুবকের নাম ইন্দ্রজিৎ কুমার। মাশরুম চাষ করে বদলে গেছে তার নিজের জীবন, পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন স্থানীয়দের কর্মসংস্থান।
সবুজে ঘেরা উপজেলার হাটফাজিলপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন “দেশবন্ধু মাশরুম খামার”। বাইরে থেকে সাধারণ একটি টিনশেড ঘর মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্য দৃশ্য। প্রায় ১১০ ফুট লম্বা ও ৪০ ফুট চওড়া ঘরে সারি সারি ঝুলছে মাশরুমের সিলিন্ডার প্যাকেট। সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো প্রায় ১০ হাজার প্যাকেট থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হচ্ছে তাজা মাশরুম। ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা।
এই খামারের উদ্যোক্তা ইন্দ্রজিৎ কুমার পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে অনেকের মতো সরকারি-বেসরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে সময় নষ্ট না করে তিনি ভাবতে শুরু করেন বিকল্প কিছু করার কথা। ২০২১ সালে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে মাশরুম চাষ শুরু করেন। শুরুটা সহজ ছিল না, পুঁজি সংকট, বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জ। তবে ধৈর্য আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান তিনি।

২০২২ সালে শুরু করেন বাণিজ্যিক উৎপাদন। বর্তমানে তার খামারে ওয়েস্টার ও মিল্কিসহ নানা জাতের মাশরুম চাষ হচ্ছে। মৌসুম ও বাজারভেদে কেজি প্রতি ২০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব মাশরুম। স্থানীয় বাজার ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় পাইকারদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে উৎপাদিত পণ্য। প্রতিদিনের পরিচর্যা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত মাদার তৈরি-সবকিছুতেই রাখা হচ্ছে বিশেষ নজর।
উদ্যোক্তা ইন্দ্রজিৎ বলেন, চাকরির পেছনে দৌড়ালে হয়তো আজও অপেক্ষায় থাকতে হতো। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে শুরু করায় আজ নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কাজ দিতে পারছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে খামার আরও বড় করতে চাই।
সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করছি। তবে আমার লক্ষ্য কেবল অর্থ উপার্জন নয়; আমি চাই এই অঞ্চলে মাশরুমভিত্তিক একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠুক।

গ্রামের তরুণদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা, চাকরির অপেক্ষায় সময় নষ্ট না করে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী উদ্যোগ নিলে কৃষিই হতে পারে সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র।
ইন্দ্রজিৎ শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি তিনি। এই খামার ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন স্থানীয় নারী-পুরুষ এখানে কাজ করছেন। মাশরুমের মাদার তৈরি, কাঠের গুড়া ও খড় দিয়ে সিলিন্ডার প্যাকেট প্রস্তুত, সংগ্রহ ও বাজারজাত-সব ধাপেই তাদের ব্যস্ততা। অনেক নারী প্রথমবারের মতো আয়মূলক কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারে স্বচ্ছলতা এনেছেন।
খামারে কাজ করা নারী শ্রমিক টুম্পা বিশ্বাস ও অর্মিতা বলেন,‘আগে বাড়ির কাজই করতাম। এখন এখানে কাজ করে মাসে নিয়মিত আয় করছি। সংসারে সাহায্য করতে পারছি।’
ইন্দ্রজিৎ ইতোমধ্যে আরও কয়েকজন তরুণকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তার দেখানো পথ অনুসরণ করে আশপাশের এলাকাতেও ছোট ছোট মাশরুম খামার গড়ে উঠছে। ফলে এলাকাজুড়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, মাশরুম চাষ একটি সম্ভাবনাময় খাত। ইন্দ্রজিৎ কুমারের মতো শিক্ষিত তরুণরা এগিয়ে এলে কৃষিতে বৈচিত্র্য আসবে। কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এসএইচএ