বিএনপি নেতা ডাবলুর জানাজা সম্পন্ন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে জীবননগর পৌর ঈদগাহ ময়দানে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সাধারণ মুসল্লিদের ঢল নামে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ডাবলুর ছোট ভাই লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
জানাজায় চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) মো. আনোয়ারুল কবীর, চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি ও বিজিএমইএর সভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিআইপি সাহিদুজ্জামান টরিক, চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর মারুফ সারোয়ার বাবু, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার অহিদুল আলমসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং শুভানুধ্যায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই দেশে এমন মৃত্যু আমরা প্রত্যাশা করি না। আমরা সঠিক বিচার চাই, যেন ভবিষ্যতে আর কাউকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডাবলুর মৃত্যুতে আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গভীরভাবে মর্মাহত। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারে পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান বলেন, এ ঘটনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রকৃত শোকের অনুভূতি যিনি হারিয়েছেন তিনিই বোঝেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই করা হবে। তদন্তে কেউ জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত ডাবলুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাফিজা ফার্মেসির সামনে থেকে তাকে আটক করা হয় এবং পরে একটি কক্ষে নেওয়া হয়। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন জানান, ১২ জানুয়ারি রাত ১২টা ১৬ মিনিটে ডাবলুকে মৃত অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জামাল আল-নাসের বলেন, জীবননগরে বিএনপি নেতাকে আটকের সময় জেলা পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে যান।
ডাবলুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত থেকেই জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। রাত ২টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। পরদিন বেলা ১১টার দিকে তিনি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে নেতাকর্মীদের শান্ত করেন। পরে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ও জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। বিচারের আশ্বাসের পর বেলা দেড়টার দিকে ডাবলুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে।
এ ঘটনায় ডাবলুর ভাই শরিফুল ইসলাম কাজল জীবননগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে তা এখনো নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
অপরদিকে ঘটনার পরদিন সকালে চুয়াডাঙ্গার অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাহাদ আহমেদ আবীর ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছিলেন, আটকের পর তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একটি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তাকে কোনো ধরনের মারধর বা নির্যাতন করা হয়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এ ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের কমান্ডারসহ অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনাসদস্যকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আইএসপিআর জানায়, গত ১২ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে যৌথ বাহিনী একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন একটি ফার্মেসি থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মো. শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে (৫০) আটক করা হয়। পরবর্তীতে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই ফার্মেসিতে তল্লাশি চালিয়ে ১টি ৯মি. মি. পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে টহল দল।
আইএসপিআর আরও জানায়, অভিযান শেষে আটক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে রাত আনুমানিক ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইএসপিআর এই ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে উল্লেখ করেছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ওই ক্যাম্পের কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনাসদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সঠিক কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আফজালুল হক/আরএআর