২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী জোড় মাছের মেলা, ইলিশ-বেগুন কিনে ফিরছেন ক্রেতারা

শরীয়তপুরের মনোহর বাজারে এবারো বসেছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী জোড় মাছের মেলা। প্রতি বছর পৌষের শেষ ও মাঘের শুরুতে হওয়া এই মেলাটির বয়স প্রায় দুইশ বছর। এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ হলো জোড় ইলিশ মাছ আর বেগুন। মেলাটির হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য শুরু হলেও এখন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এ মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। তবে ইলিশের দাম কিছুটা চড়া হওয়ায় এবারে হতাশ ক্রেতারা।
মাঘ মাসের প্রথম দিন আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সদর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকার কালি মন্দির মাঠে মেলাটি বসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের মনোহর বাজার ও তার আশপাশের এলাকার দুইশ বছরের ঐতিহ্য এই ইলিশ মাছের মেলা। এদিন মেলায় আসা সবাই ঘরে ফেরেন জোড়া ইলিশ আর বেগুন নিয়ে। তাই এর নাম জোড় মাছের মেলা। মেলাকে ঘিরে ছোটদের আগ্রহও থাকে অনেক বেশি। বড়দের সঙ্গে মেলায় গিয়ে মিষ্টি খাওয়ার পাশাপাশি রঙবেরঙের বেলুন আর খেলনা হাতে বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে খুশি মনে বাড়ি ফেরে তারা। তবে ইলিশ মাছের দাম কিছুটা বাড়ায় হতাশ ক্রেতারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর হতেই অস্থায়ী খোলা মাঠে চৌকি পেতে ডালায় ইলিশ মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন মাছ বিক্রেতারা। পাশেই রয়েছে সবজি, খেলনা আর নানা খাবারের দোকান। কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে ক্রেতা-বিক্রেতার হাক ডাকে জমে উঠেছে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
চিরঞ্জিত দে নামে এক ক্রেতা বলেন, বাবার সঙ্গে ছোট থেকেই এই মেলায় আসতাম। এই মেলা আমাদের ঐতিহ্য। আমরা মাঘের শুরুর দিন মেলায় এসে জোড়া ইলিশ আর জোড়া বেগুন কিনে ঘরে ফিরি।
জোড়া ইলিশ আর জোড়া বেগুন কিনে বাড়ি ফিরছেন সাগর দাস। তিনি বলেন, প্রতিবারের ন্যায় এবারও জোড় মাছের মেলা বসেছে। মেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ বইছে। তাই সঙ্গে করে সন্তানকে নিয়ে এসেছি। মেলায় এসে খেলনা কিনেছে। নানা ধরনের খাবারের দোকানো বসেছে। তবে এবছর মাছের দামটা একটু বেশি।
হাসান আলী নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মাঘের শুরুতে এখানে মাছের মেলা বসে। আমরাও এই মেলায় আসি, ইলিশ মাছ কিনি। আমাদের সবার অংশগ্রহণে মেলাটি আরও জমে উঠেছে।
বাপ-দাদার আমল থেকে মেলায় বংশানুক্রমে মাছ বিক্রি করে আসছেন স্থানীয় মাছ বিক্রেতারা। মেলা উপলক্ষে মাত্র তিন ঘণ্টায় বিক্রি হয় অন্তত ২৫-৩০ লাখ টাকার মাছ। আর মাছের দাম ভালো পাওয়ার খুশি বিক্রেতারাও। গৌতম দাস নামের এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, আমার বাবা আগে এখানে মাছ বিক্রি করতেন। তার আগে তার বাবা মাছ বিক্রি করেছেন, এখন আমি মাছ বিক্রি করি। ভোর থেকে শুরু হয়ে এই মেলাটি চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত। এই কয়েক ঘণ্টায় এখানে অন্তত ২৫-৩০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। এ বছর মাছের দাম ভালো পাওয়ায় আমরা খুশি।
ঐতিহ্যবাহী মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য সুজিত দাস বলেন, পুরোনো এই জোড় মাছের মেলাটি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বন্ধনের এক দৃষ্টান্ত উদাহরণ। মেলাটি একসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হলেও কালের বিবর্তনে এখন সবাই এই মেলায় অংশ নেয়। হিন্দুদের ন্যায় মুসলিম ধর্মের মানুষেরা এই মেলায় আসে, ইলিশ মাছ কিনে নেয়। আমরা ধারাবাহিকতার সঙ্গে মেলাটি আগামীতেও পরিচালনা করে যাব।
নয়ন দাস/আরকে