জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুলে বিপাকে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ১০৪ শিক্ষার্থী

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে ২০২২-২০২৩ শিক্ষা বর্ষের মাস্টার্স শেষ পর্বের ১০৪ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন পড়েছে অনিশ্চিয়তার মধ্যে। কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তিকৃত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নির্ধারিত ফি ৩ হাজার ৮৭৫ টাকা সোনালী সেবার মাধ্যমে জমা প্রদান করে। পত্র কোড এন্ট্রির ফি’ও এর সাথে অন্তর্ভুক্ত আছে। রহস্যজনক কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভর্তি ফি ও জরিমানা দাবি করায় বিড়ম্বনায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ের ফিশারিজ ও ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজি নামে দুটি শাখা রয়েছে। শাখা দুটির মধ্যে এই কলেজে ফিশারিজ শাখার বিষয়গুলো পড়ানো হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তির পত্র কোড এন্ট্রি দিতে গিয়ে ভুলবশত ফিশারিজ শাখার পরিবর্তে ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজি শাখার বিভিন্ন পত্রের কোড এন্ট্রি দেওয়া হয়। এ ধরনের ভুল হওয়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তারা লিখিতভাবে জানাতে বলে এবং সেই অনুযায়ী কলেজ কর্তৃপক্ষ গত বছরের ২৬ অক্টোবর একটি পত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করে।
উক্ত পত্রের আলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০ নভেম্বর সার্ভার খুলে দিলে ফিশারিজ শাখার বিভিন্ন পত্রের সঠিক কোড যথাযথভাবে এন্ট্রি দিয়ে ডাউনলোড করে হার্ড কপি সংরক্ষণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায় এন্ট্রি নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি পত্রের মাধ্যমে জানিয়েছে, পুনরায় পত্র কোড এন্ট্রির জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ৬০০ টাকা হারে এবং জরিমানা ৫ হাজার টাকাসহ ১০৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য মোট ৬৭ হাজার ৪০০ টাকা জমা প্রদান করার নির্দেশ প্রদান করে।
টাকা জমা দিতে না পারায় কলেজ কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে সমাধানের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিমকে রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোডের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় পত্রসহ একটি আবেদন পত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করে। তিনি এ বিষয়ে সংশোধনের উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ ডিনের সাথে সারাদিন অপেক্ষা করেও সাক্ষাৎ করতে পারেননি। উপ-রেজিস্ট্রারের সাথে দেখা করলে তিনি জানান মোট ২৭টি কলেজের সাথে আপনাদের কলেজের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ রকম হয়েছে। কিন্তু বাকি ২৬টি কলেজ থেকে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ কলেজের পত্র কোড এন্ট্রি হয়েছে এবং কপিও ডাউনলোড করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ কোনোভাবেই জরিমানার আওতায় পড়ে না। অন্য কলেজের সাথে ভুলবশত কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার মাশুল গুণতে হচ্ছে কলেজ এবং শিক্ষার্থীদের।
কলেজের শিক্ষার্থী মো. শফি আলম বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় আমাদের ওপর জরিমানা চাপায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জরিমানা ও অতিরিক্ত ফি এর চাপে পিষ্ট। ইনকোর্স পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১০০ টাকা আদায় করে। বিলম্বে ফরম পূরণের জন্য ৬ হাজার জরিমানা, কেউ কন্ডিশনাল প্রমোটেড হলে তার জন্য দেড় হাজার টাকা অতিরিক্ত ফি, বিষয় পুনঃমূল্যায়নের আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতি পত্রে ১২শ টাকা ফি, ভর্তি বাতিল করে পুনরায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে বাতিল বাবদ ৭০০ টাকা এবং পুন:বহাল করতে গেলে আবার এক কাজার টাকা প্রদান করতে হয়। সাময়িক সনদ ফি বাবদ ৫০০ টাকা এবং নম্বর পত্রের ফি বাবদ ৫০০ টাকা পরীক্ষার পাশের আগেই নেওয়া হয়। তবে ফেল করলে বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণে না করলে আবারও ২০০ টাকা করে প্রদান করতে হয়।
কলেজ শিক্ষার্থী মাহমুদা খাতুন বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যাগরিষ্ট সন্তানরা মেধা থাকার পরেও আর্থিক অনটনের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, কিন্তু এখানকার ফি ও প্রতিটি কাজে জরিমানার পরিমাণ এত বেশি যে আমাদের পক্ষে পড়াশোনার বাড়তি ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়েছে।
মাস্টার্স পরীক্ষার্থী অনন্যা রানী ও আমিনুর রহমান জানায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এরুপ সিদ্ধান্তে আমরা হতবাক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতেছি। আশা করি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুবিবেচনা করবে। তারা প্রয়োজনে শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মীর্জা নাসির উদ্দীন বলেন, বিষয়টি নিয়ে ডিন ও উপ-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, সারাদেশের তুলনায় কুড়িগ্রামের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ জেলার অধিকাংশ অভিভাবক গরিব। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিভিন্ন রকমের ছোট খাট কর্ম করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করে পড়াশোনা করে থাকে। কিছু শিক্ষার্থী রিকশা বা অটো চালায়, নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কিংবা হোটেলেও কাজ করে। এ সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত জরিমানার ব্যয় বহন করা অসম্ভব।
প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কলেজের বেসরকারিখাতে আদায়কৃত সকল অর্থই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়ে থাকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত যত টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে তা সবই শিক্ষার্থীদের টাকা। সেক্ষেত্রে তাদের নোটিশে যাই বলা হোক না কেন তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের বহন করতে হবে। পত্র কোড এন্ট্রির বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলাজনিত কোনো কিছু ঘটে নাই। বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুসারে কাজও করেছে। সেক্ষেত্রে জরিমানার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত।
মমিনুল ইসলাম বাবু/এমএএস