শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্স চক্রের হাতে আবারও রোগীর মৃত্যু, গ্রেপ্তার ১

শরীয়তপুরে রোগী পরিবহন এখন জীবনরক্ষার নয়, বরং জীবননাশের ঝুঁকি হয়ে উঠছে। একটি প্রভাবশালী অ্যাম্বুলেন্স চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা। গত বছরের আগস্টে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ঘটনায় এক নবজাতকের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মাস না যেতেই একই কায়দায় আবারও এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে জমশেদ আলী ঢালী (৭০) নামের এক রোগীকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দুই দফায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া ও জামতলা এলাকায় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের সহযোগিতায় মুক্ত হলেও ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান জমশেদ আলী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই একই চক্র এবারও সক্রিয়। জমশেদ আলীর পরিবারের অভিযোগ, ওই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সুমন খানের নেতৃত্বেই এবারও অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়েছে। সুমনের সঙ্গে থাকা ৮-১০ জনও পেশায় অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালক।
গত বছরের ১৪ আগস্ট নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের, স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক গাড়িচালক আবদুল হাই মোল্লা এবং চালক রহিম ও বিল্লাল মুন্সিসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নবজাতকের বাবা নূর হোসেন সরদার। পুলিশ তদন্ত শেষে গত ৩১ ডিসেম্বর আদালতে যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে, তাতে এই চারজন ছাড়াও সুমন খানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, জেলায় বর্তমানে ২৭টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করেন নবজাতক মৃত্যুর মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আব্দুল হাই মোল্লা, আবু তাহের, চালক সুমন খান ও আবু তাহেরের ছেলে চালক রহিম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়ার ভাড়া চার হাজার টাকা। আর চক্রের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ভাড়া দিতে হয় ৭-৮ হাজার টাকা। অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে গেলে কিংবা চক্রের অনুমতি ছাড়া রোগী তুললে সেটি আটকে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ ঘটনায় নিহত জমশেদ আলী ঢালী শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এ ঘটনায় বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে সদরের পালং মডেল থানায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন নিহতের নাতি জুবায়ের হোসেন।
বিজ্ঞাপন
মামলার আসামিরা হলেন– সদর উপজেলার কাচারি কান্দি এলাকার চালক সুমন খান (৩২), সজীব (২৮), হান্নান (২৫) ও নড়িয়া উপজেলার পারভেজ (২৬)। মামলার পরপরই প্রধান আসামি সুমন খানকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ঘটনায় জমশেদ আলী নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে; এমন অভিযোগে বুধবার রাতে মামলা হয়েছে। আমরা প্রধান আসামি সুমন খানকে গ্রেপ্তার করেছি। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের ও শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আবদুল হাই মোল্লা। সিভিল সার্জন ডা. মো. রেহান উদ্দিন জানান, গত বছরের ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণে কোনো সরকারি নীতিমালা নেই। তবে তারা যাতে নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকে, সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সভা করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন।’
নয়ন দাস/বিআরইউ