রোগীর থেকে নেওয়া হয় না অক্সিজেনের দাম, মৃত্যু হলে বিল মওকুফ

দেশজুড়ে যখন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই, তখন ফরিদপুর শহরের একটি হাসপাতাল ব্যতিক্রমী মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। আরোগ্য সদন প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীদের অক্সিজেন ব্যবহারের জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগী মারা গেলে, তার সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বেসরকারি উদ্যোগে ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি হাসপাতালটি ফরিদপুর শহরের মুজিব সড়কের পাশে নিলটুলী মহল্লা এলাকায় স্থাপন করা হয়। সেই থেকে গত ৩৬ বছরে এ নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
জানা গেছে, শুধু এই বিষয় দুটিই নয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি এ হাসপাতালের উদ্যোগে নানাবিধ সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করা হয়। এর মধ্যে দুস্থ মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহে অনুদান প্রদান, ক্যান্সার আক্রান্ত দুস্থ রোগীদের চিকিৎসা খরচও ছাড়মূল্যে করা হয়।
১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি শহরের নিলটুলী মহল্লার একটি ভাড়া ভবনে পাঁচজন অংশীদারের তত্ত্বাবধানে এ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। এর ১০ বছর পর ২০০১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর ৮তলা বিশিষ্ট নিজস্ব ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করা হয়।
শুরুতে এ হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন পাঁচজন। বর্তমানে তা বেড়ে ২০ জন হয়েছে। শুরুতে হাসপাতালটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট ছিল, বর্তমানে শয্যার সংখ্যা ১৩০টি। শুরুতে এ হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফের সংখ্যা ছিল ৪৫ জন, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৩৮ জন। হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২৩টি বিভাগে বিভিন্ন ধরনের রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে।
এই হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়েছিলেন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা আকলিমা বেগম (৫৭)। তিনি বলেন, ২০২১ সালে আমি শ্বাসকষ্টসহ নানান জটিলতা নিয়ে আরোগ্য সদন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে আমাকে বেশ কয়েকদিন ভর্তি থাকতে হয়েছিল। ওই সময় টানা তিন দিন আমাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হয়েছে। সেই অক্সিজেনের টাকা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে ছাড় দিয়েছিল। আমি ভর্তি হওয়ার সময় এটা জানতাম না। পরে বিল দেওয়ার সময় এটা জানতে পেরেছি। আমার অনেকগুলো টাকা বেঁচে গিয়েছিল। যা আজও আমার মনে পড়ে।ফরিদপুরের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর মধ্যে এই হাসপাতালটা এজন্য ব্যতিক্রম।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আওলাদ হোসেন বলেন, যাত্রা শুরুর সময় তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল। তারা হলেন ডা. মোহাম্মদ জাহেদ, ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী ও ডা. খান আনোয়ার আক্তার ফারুক। এরা তিনজনই বর্তমানে প্রয়াত। যাত্রা শুরুর সময় ওই তিন উপদেষ্টা হাসপাতালের পরিচালকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে অক্সিজেন বাবদ কোনো টাকা নেবে না এবং কোনো রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে তার বিল নেবে না। শুরুর দিন থেকে আমরা ওই দুটি পরামর্শ মেনে চলছি।
আরোগ্য সদন প্রাইভেট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৩৬ বছরে রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহের ৬০ হাজার ১৫৩টি সিলিন্ডার বাবদ এক কোটি ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫৬ টাকা এবং চিকিৎসাধীন এক হাজার ৮২২ জন মৃত রোগীর ক্ষেত্রে ২৯ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গত ৩৫ বছরে এ হাসপাতালে ক্যান্সার আক্রান্ত এক হাজার ৬৮২ রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২২ লাখ ৬২ হাজার ২৯০ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
গত তিন বছর আগে এ হাসপাতালে সিসিইউ ইউনিট চালু হয়। তিন বছরে এ ইউনিটে মোট এক হাজার ৭৩০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬ জন রোগী মারা গেছেন। মারা যাওয়া ওই ৪৬ জন রোগীর বিল বাবদ এক লাখ ৭২ হাজার টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক কাজের মধ্যে গত ৩৫ বছরে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, হতদরিদ্র ব্যক্তি, এতিম ও প্রতিবন্ধীদের সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে। একই সময়কালে বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে।
গত ৩৫ বছরে এ হাসপাতালের সহযোগিতায় দুস্থ ও দরিদ্র মেধাবীদের মধ্যে চারজন চিকিৎসক, একজন ডেন্টাল সার্জন, দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট, তিনজন প্রকৌশলী হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এখনও ২৪ জন শিক্ষার্থী এ হাসপাতালের সহযোগিতায় তাদের উচ্চ শিক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যয় বাবদ হাসপাতাল থেকে ইতোমধ্যে ব্যয় করা হয়েছে ৩৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, যা চলমান রয়েছে।
ফরিদপুর সচেতন কমিটি (সনাক)-এর সাবেক সভাপতি শিপ্রা গোস্বামী বলেন, চিকিৎসায়, সামাজিক কাজে ও শিক্ষাবৃত্তিতে আরোগ্য সদন হাসপাতালটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। “মানুষ মানুষের জন্য”—এ সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ হাসপাতালটির কোনো তুলনা নেই। বড় বড় নামীদামি হাসপাতালের ক্ষেত্রে আমাদের শুনতে হয় টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত মৃতদেহ আটকে রাখা হয়। সেখানে এ হাসপাতালটি শুরু থেকে বিনামূল্যে অক্সিজেন দেওয়া ও চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যু হলে তার সমস্ত বিল মওকুফ করে এক নজির স্থাপন করেছে, যা আমাদের জন্য একটি উদাহরণ।
প্রবীণ শিক্ষক ও ফরিদপুরের বিশিষ্ট সংস্কৃতিসেবী অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, হাসপাতালগুলো যেখানে সেবাকে পণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, সেক্ষেত্রে আরোগ্য সদনের মানবতাবাদী ভূমিকা একটি প্রশংসনীয় ব্যতীক্রম। যদি দেশের সব হাসপাতাল আরোগ্য সদনের মতো দয়াময় এক একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারত, তাহলে দারিদ্র্যপীড়িত এ দেশের মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারত।
জহির হোসেন/আরকে