‘হ্যাঁ’ ভোট মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ভোট যার যেখানে ইচ্ছা দেবে, কিন্তু আমরা ভোটের বাক্স পর্যন্ত ভোটারকে পৌঁছে দিতে চাই। ওই বাক্স পর্যন্ত ভোটার পৌঁছানোর পরে নিজের ভোটের হিসাব তারা গ্রহণ করবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, আমরা ১৩ তারিখ থেকে আল্লাহ তায়ালার নিকট একটা নতুন বাংলাদেশ চাই। অভিশাপ মুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমার মায়ের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। শিশুদের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। আবাল বৃদ্ধ বনিতার জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। সেই বাংলাদেশ চাইলে এখন থেকে দুটি ভোটের ব্যাপারে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই হচ্ছে আজাদি, ‘না’ ভোট মানে হচ্ছে গোলামি। ১২ তারিখ ভোট হবে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে। প্রথম ভোট ‘হ্যা’। এর পরের ভোটটা হবে ইনসাফের পক্ষের।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনেকেই পুরাতন ফ্যাসিবাদের অ্যাপ্রোন গায়ে দিতে চায় উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, যুব সমাজ জানিয়ে দিয়েছে, আমরা বস্তাপচা ওই পুরাতন বন্দোবস্ত চাই না। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ সচেতন, শিক্ষিত, সুশিক্ষিত ও উচ্চ শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা তাদের রায় দিয়ে বলে দিয়েছে আমরা এখন ইনসাফের পক্ষে, নতুন বাংলাদেশের পক্ষে, আমরা এখন ঐক্যের পক্ষে, বিভক্তির পক্ষে নই।
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, আশ্চর্য বিষয় আমাদের একটা বন্ধু সংগঠন, তারা ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা করেছেন এবং এটাও বলেছেন এটা মায়ের হাতে দেবেন। তারা একদিকে দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড, আর একদিকে দিচ্ছেন আমার মায়ের গায়ে হাত। এই দুইটা একসাথে চলে না। আমরা অনুরোধ করবো নিজের মাকে সম্মান করুন। যদি আপনি নিজের মাকে সম্মান করতে পারেন তাহলে গোটা মায়ের জাতিকে সম্মান করতে পারবেন। আর যদি নিজের মাকে সম্মান করতে না পারেন, আপনি বাংলাদেশের একজন নারীকেও সম্মান করতে পারবেন না।
শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়েছে, মাথা গরম হয়ে গিয়েছে। জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা রাখুন। অতীতে জনগণের রায়ের প্রতি যারা সম্মান করেনি তাদের পরিণতি কী হয়েছে তার থেকে আমাদের সকলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। জনগণের গায়ে হাত দিতে পারবেন, পিঠে চাবুক মারতে পারবেন কিন্তু জনগণের হৃদয়-কলিজায় জায়গা করতে পারবেন না। হৃদয় কলিজা জয় করতে হলে সকলকে তার নিজ নিজ জায়গায় সম্মান দিতে হবে। বিশেষ করে মায়ের জাতিকে।
তিনি বলেন. আমাদের কথা একেবারে স্পষ্ট জীবন দিব, আমার মায়ের ইজ্জত দেব না। মায়ের ইজ্জতের জন্য লড়ে যাব। সুতরাং কেউ এই অপকর্ম করবেন না। যারা করেছেন, তওবা করে নেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে মাফ চেয়ে নেন। তিনি চাইলে মাফ করে দিতে পারেন। আল্লাহ আপনাকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু সেই কালো হাত আর যদি সামনে বাড়ানোর চেষ্টা করেন, আমরা গালে হাত দিয়ে বসতে পারবো না ভাই। আমরা কারও পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাঁধাতে চাই না। কিন্তু কেউ ঝগড়া বাঁধাতে আসলে ছেড়েও দেওয়া হবে না।
জামায়াতের আমির বলেন, আমরা কর্মক্ষেত্রে মামা, খালুর হিসাব-নিকাশ নেব না। ওই টেলিফোন আমাদের কাছে অচল। আমরা ইনসাফের ভিত্তিতে যার পাওনা তার হাতে তুলে দেব। এমনকি আমরা এটাও দেখবো না, একজন উপযুক্ত নাগরিক তিনি কোন ধর্মে বিশ্বাসী। আমরা দেখবো তিনি এই কাজের জন্য উপযুক্ত কিনা। তিনি যদি উপযুক্ত ব্যক্তি হন তাকে তার সম্মানের জায়গা উপযুক্ত স্থানে বসিয়ে দেওয়া হবে।
যুবকদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, যুবক বন্ধুরা তোমরা বুক চিতিয়ে লড়াই করে আমাদেরকে মুক্তি এনে দিয়েছো, তোমাদেরকে মোবারকবাদ। কিন্তু আমরা তোমাদের হাতে বেকারের ভাতা তুলে দিয়ে অপমান করতে চাই না। আমরা তোমাদের প্রত্যেকটি যোদ্ধার হাতকে কর্মী এবং কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই। যুবক-যুবতীদের হাতে মর্যাদার সেই কাজগুলো তুলে দিতে চাই। সেদিন তুমি গর্ব করে বলবে আমি আমার নতুন বাংলাদেশের একজন গর্বিত কারিগর। আমারও অবদান আছে, আমি বসে বসে বেকার ভাতা খাই না। বরং আমি আমার জাতিকে দিতে চাই। আমরা এই ভাবেই আমাদের যুব সমাজকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে একদিকে দেশ গড়া, আর একদিকে তাদেরকে সম্মানিত করতে চাই। যদি এটা আমরা পারি তাহলে বিপ্লবে তোমাদের ভূমিকার কিছুটা হলেও ঋণ পরিশোধ করতে পারলাম বলে সান্ত্বনা পাবো।
নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ এই নতুন বাংলাদেশ আল্লাহ যদি আমাদেরকে গড়ার সুযোগ দেন, এই নতুন বাংলাদেশে আপনি আপনার নিজ গৃহে অবস্থানস্থলে, আবাসভূমিতে আপনি চলাচলের সময় এবং কর্মক্ষেত্রে সব জায়গাতে দুটি জিনিস আপনাদেরকে আমরা নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একটি আপনাদের মায়ের মর্যাদা, দ্বিতীয়টি আপনাদের নিরাপত্তা। এই দুটো ইনশাআল্লাহ আমরা নিশ্চিত করবো।
জামায়াতের আমির বলেন, খুলনাকে এক সময় বলা হতো শিল্পের রাজধানী, শিল্প ৫৪ বছরে বিকশিত না হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। একে একে সবগুলো, সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিল্প কল-কারখানা বন্ধ হয়ে আছে। দুনিয়ার দেশগুলো শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা শিল্পকে একটা একটা করে খুন করছি।
তিনি বলেন, এই শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। এখানে একজন মানুষ বেকার হয়নি, একজন মানুষ বেকার হওয়ার সাথে সাথে একটা পরিবার বিপদের মুখে পড়ে গিয়েছে। আমরা ইনশাআল্লাহ জনগণের ভালোবাসায়, সমর্থনে, ভোটে, রায়ে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় যদি এদেশের সেবা করার সুযোগ পাই, আমরা কথা দিচ্ছি বন্ধ নয়, বন্ধগুলো খুলবো। নতুন করে ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করা হবে। আমাদের সন্তানদের হাতে কাজ তুলে দেওয়া হবে। ছেলেরা কাজ করবে, মেয়েরা কাজ করবে স্বস্তির সাথে, নিরাপত্তার সাথে কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।
শফিকুর রহমান বলেন, খুলনা অঞ্চল ছিল এক সময় ইন্ডাস্ট্রি এবং কৃষিতে সমানতালে পাল্লা দেওয়ার। দুইটাই এখন শেষ। জলাবদ্ধতা, লবণাক্ত পানির কবলে পড়ে, দফায় দফায় বাঁধ ভাঙনে জোয়ার আসার কারণে কৃষকদের একেবারেই বিধ্বস্ত অবস্থা। আল্লাহ যদি এই দেশের খেদমতের দায়িত্ব দেন কথা দিচ্ছি আপনাদের সাথে বসে আপনাদের সাথে ডায়ালগ করে কোন কাজটি আগে করলে এই এলাকার উন্নয়ন হবে, দেশের উন্নয়ন হবে আমরা তা ঠিক করবো। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আপনাদের সম্পদ আপনাদের হাতে তুলে দেব উন্নয়নের জন্য। এটা আমাদের বাপ-দাদার সম্পদ হবে না। এটা হবে জনগণের সম্পদ। প্রত্যেকটি সম্পদের বাজেটের জবাব নেওয়ার অধিকার আপনাদের নিশ্চিত করা হবে।
জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির নেতা রাশেদ প্রধান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, খুলনা-৬ আসনে জামায়াত মনোনীত এবং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-৪ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত এবং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দেওয়াল ঘড়ির প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খুলনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত এবং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত এবং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী প্রমুখ।
মোহাম্মদ মিলন/আরএআর