বগুড়ায় আত্মহত্যার ভয়ঙ্কর চিত্র, এক বছরে প্রাণ দিয়েছে ৪১১ জন

জীবনের প্রতি অনীহা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বগুড়ায় আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই বগুড়া জেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। যা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বগুড়ার আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ১০০ জন, শিবগঞ্জ ও দুপচাঁচিয়ায় ৩৭ জন করে, আদমদীঘিতে ৩৫ জন, শাজাহানপুর ও শেরপুরে ৩২ জন করে, ধুনটে ২৮ জন, সারিয়াকান্দিতে ২৭ জন, গাবতলীতে ২৬ জন, কাহালুতে ২১ জন, সোনাতলায় ২০ জন, নন্দীগ্রামে ১৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগজনক চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩৮৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন এবং ২০২৪ সালে ৩৩৫ জন। এ হিসাবে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে জেলায় মোট ১ হাজার ৫১৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সী। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ, দাম্পত্য কলহ কিংবা সামাজিক অপমান মানুষকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক নির্যাতন ও দাম্পত্য সংকট বড় কারণ হলেও পুরুষদের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক ব্যর্থতার অনুভূতি আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ ও অপরাধ বিশ্লেষক মোস্তফা কামাল বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। মূল কারণ হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী হতাশা। সিজোফ্রেনিয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগসহ নানা মানসিক রোগ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিলে বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং পরিবার ও সমাজের সমর্থন আত্মহত্যা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ আত্মহত্যার আগে কিছু সতর্কসংকেত দেখা যায় আচরণগত পরিবর্তন, নিঃসঙ্গতা, হতাশা, মৃত্যুচিন্তার কথা বলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু পরিবার ও সমাজ অনেক সময় এসব লক্ষণকে গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
জাতীয় কবিতা মঞ্চ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি কবি ও লেখক ফাতেমা ইয়াসমিন বলেন, ২০২৫ সালে শুধু বগুড়াতেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪১১ জনের, যা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। গোটা দেশের জরিপ প্রতিবেদনও পরিস্থিতিকে বিপদজনক বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি নওগাঁর একটি গ্রামে মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার আবদার পূরণ না হওয়ায় এক কিশোর আত্মহত্যা করে। আবার কোথাও পরকীয়া সম্পর্কের বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য জীবনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
এই গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও প্রেমঘটিত বিষয়, আর দাম্পত্য জীবনে পরকীয়া, অতিরিক্ত জেদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তিই আত্মহত্যার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিষয়টি এখন আর ব্যক্তিগত নয় এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট।
বগুড়া মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স ইউনিটি'র সভাপতি মাজেদুর রহমান বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে কেবল আইনি তৎপরতা বা প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার বলয় তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। সেই সাথে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সংকটাপন্ন ব্যক্তির প্রতি সামাজিক সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে, গণমাধ্যমগুলোতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে আমরা এই নীরব ঘাতক ব্যাধি রুখে দিতে পারি।
বগুড়া জেলা সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হান্নান বলেন, বর্তমানে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। পড়াশোনা, পরীক্ষার ফলাফল, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক তুলনার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে। তিনি বলেন, আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য সামাজিক সমস্যা। সময়মতো সহানুভূতিশীল মনোযোগ, মানসিক সহায়তা এবং পারিবারিক বন্ধন জোরদার করা গেলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
আব্দুল মোমিন/এমএএস