অভিজ্ঞতায় এগিয়ে বিএনপি, নজর কাড়ছে জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন

নোয়াখালীর ৬টি সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। অভিজ্ঞ নেতা থেকে নতুন মুখ, দলীয় প্রভাব থেকে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব মিলিয়ে প্রতিটি আসনে ভোটের সমীকরণ জটিল ও বৈচিত্র্যময়। নোয়াখালী-১ থেকে নোয়াখালী-৬ পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে কৌশলগত প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী আংশিক) সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভোটের সমীকরণ। যাচাই-বাছাই শেষে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বাদ পড়ায় চূড়ান্তভাবে সাতজন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকলেও অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের বিচারে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তবে বিকল্প শক্তি হিসেবে ভোটারদের নজর কাড়তে শুরু করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. ছাইফ উল্লাহ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জহিরুল ইসলাম।
চাটখিল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭১১ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৮ হাজার ৭১৪ জন। মোট ১৪১ টা ভোট কেন্দ্রের মধ্যে একটিও নেই অস্থায়ী কেন্দ্র। তবে আছে ৮৮৯ টি ভোট কক্ষের মধ্যে ৩১ টি অস্থায়ী ভোট কক্ষ। বড় ভোটারভিত্তির এই আসনে প্রতিটি দলই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সাত প্রার্থী হলেন— ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর মো. ছাইফ উল্যাহ, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জহিরুল ইসলাম, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মো. নুরুল আমিন, ডাব প্রতীকে বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. মনিনুল ইসলাম, আপেল প্রতীকে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের মো. মশিউর রহমান এবং তারা প্রতীকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) মনোনীত প্রার্থী রেহানা বেগম।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ছাড়া অন্য সব প্রার্থী এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। খোকন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নিলেও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচিতি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা মিলিয়ে এই আসনে দলটি আপাতত এগিয়ে রয়েছে। তবে ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধানে থাকায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রার্থীরাও আলোচনায় উঠে আসছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. ছাইফ উল্লাহ পেশায় শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ব্যক্তিগত সততা, সহজ-সরল জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে তার প্রতি এক ধরনের আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। নীরব সমর্থনও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ভিন্ন পরিচয়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তিনি পূর্বে যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক ছিলেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। ৪৪ বছর বয়সী এই প্রার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। প্রবাসে রেমিট্যান্স পাঠানোর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি গত বছর বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবেও মনোনীত হন। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় তরুণ ও সচেতন ভোটারদের একটি অংশ তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. ছাইফ উল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। শিক্ষকতা ও সামাজিক কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সুখ–দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। জনগণ যদি আমাকে নির্বাচিত করেন, তাহলে দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করব। এলাকার শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক উন্নয়নই হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার তাগিদ থেকেই আমি প্রবাসের জীবন ছেড়ে নির্বাচনে এসেছি। রাজনীতিকে আমি সেবা হিসেবে দেখি। জনগণ যদি আমাকে সুযোগ দেন, তাহলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই। তরুণ সমাজের প্রত্যাশা পূরণে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই আসনের মানুষ আমাকে আগেও সংসদে পাঠিয়েছেন। তাদের সুখ–দুঃখ, সমস্যা ও সম্ভাবনা আমি ভালোভাবে জানি। আমার অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে নোয়াখালী-১ আসনের সার্বিক উন্নয়ন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করব।
হাসিব আল আমিন/আরকে