সুষ্ঠু নির্বাচন যেসব প্যারামিটারের ওপর নির্ভর করে

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়। নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানে শুধু ভোটের দিন শান্তি বজায় রাখা নয়, বরং দীর্ঘ সময়জুড়ে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে জনগণ নিশ্চিত থাকে যে, তাদের মতামত কোনোভাবে বিকৃত হবে না।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এই কারণেই নির্বাচনকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে—যার প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট প্যারামিটার কার্যকর থাকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় নির্বাচনকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দিয়েছেন জোসেফ শুম্পেটার (Joseph Schumpeter)। তিনি গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে, যেখানে জনগণ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক বাছাই করে। এই তত্ত্ব বাস্তবে কার্যকর হতে হলে প্রতিযোগিতার পরিবেশটি হতে হয় বাস্তব ও অর্থবহ।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল উভয়েই প্রচারণার ক্ষেত্রে একই নির্বাচনী আইন ও বিধিনিষেধের আওতায় থাকে। সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি থাকে এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় কাউন্সিলর—সবাই যথাযথ নির্বাচনী আচরণবিধির অধীন। এর ফলে নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। আর যেখানে প্রতিহিংসার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা একটি আদর্শ রূপে পরিণত হয়।
রবার্ট ডালের (Robert A. Dahl) পলিআর্কি (Polyarchy) তত্ত্ব সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারণাকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। ডাল দেখিয়েছেন, কেবল ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেই গণতন্ত্র সম্পূর্ণ হয় না; বরং নাগরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সমতার পরিবেশ অপরিহার্য প্যারামিটার।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সুইডেনের নির্বাচনব্যবস্থা একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয় এবং নির্বাচনী সংবাদে পক্ষপাত এড়াতে শক্তিশালী মিডিয়া এথিকস কার্যকর থাকে। ফলে ভোটাররা শুধু আবেগ নয়, বরং নীতি, কর্মসূচি ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এই প্যারামিটারে সাধারণভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা সংবিধানে সুরক্ষিত এবং এই স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্য, কর্মসূচি, নীতি নিয়ে সমানভাবে তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়।
আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসন হবে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং নিয়মনির্ভর। অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করলেও শাস্তির মুখে পড়তে হয়।
সুইডেনে স্বাধীন পাবলিক সার্ভিস সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান—যেমন SVT (Sveriges Television) ও SR (Sveriges Radio)- আইনগতভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাত এড়াতে বাধ্য এবং সব প্রধান রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বরের জন্য সমান সুযোগ রাখে। এই কাঠামোর কারণে ভোটাররা বিভিন্ন দলের নীতি, কর্মসূচি ও বাস্তব তথ্য নিয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়, শুধু আবেগ বা গুজবে নয়।
সুইডেনে ২০২২ সালের নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর পলিসি, বিশেষত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টিং এবং রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকরা বিরোধী পক্ষসহ সব দলের বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরে বিশ্লেষণ করেছে। এই পরিবেশই ভোটারদের আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে, যা ডালের পলিআর্কি তত্ত্বের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষমতার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্বের কথা বলেছেন স্যামুয়েল হান্টিংটন (Samuel P. Huntington)। তার মতে, গণতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অপরিহার্য। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন বা সমমানের সংস্থার মাধ্যমে।
কানাডার নির্বাচনব্যবস্থা একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হলেও সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকলেও নির্বাহী বিভাগের পক্ষে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করার পথ কার্যত বন্ধ।
আরও পড়ুন
আইনের শাসন সুষ্ঠু নির্বাচনের আরেকটি কেন্দ্রীয় প্যারামিটার। অ্যারিস্টটল (Aristotle) থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত যে, আইন যদি শাসকের চেয়ে দুর্বল হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল একটি আবরণে পরিণত হয়। জার্মানিতে নির্বাচনী অর্থায়ন সংক্রান্ত বিধান অত্যন্ত কঠোর। কোনো দল বা প্রার্থী যদি অবৈধ অনুদান গ্রহণ করে, তবে শুধু জরিমানা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এই কঠোরতা রাজনীতিতে জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি করেছে এবং নির্বাচনী ফলাফলের প্রতি জনগণের আস্থা দৃঢ় করেছে।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন কল্পনাই করা যায় না। ম্যাক্স ওয়েবারের ব্যুরোক্রেসি তত্ত্ব (Bureaucracy Theory) অনুযায়ী, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসন হবে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং নিয়মনির্ভর। অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করলেও শাস্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকে না।
ভোটার অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। কার্ল ডয়চ গণতন্ত্রকে একটি যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ থাকা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যালট, র্যাম্প ও সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালিতে প্রবাসী নাগরিকদের জন্য আলাদা নির্বাচনী আসন পর্যন্ত নির্ধারিত আছে, যাতে তারা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে যুক্ত থাকতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক নির্বাচনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এস্তোনিয়ার ই-ভোটিং ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে, সঠিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রযুক্তি ভোটার অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, প্রযুক্তি নিজেই সমাধান নয়; এটি বিশ্বাসযোগ্য না হলে গণতন্ত্রকে দুর্বলও করতে পারে। তাই উন্নত রাষ্ট্রগুলো প্রযুক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী অডিট, পর্যবেক্ষণ এবং নাগরিক আস্থার ওপর সমান জোর দেয়।
সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো একক শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের তত্ত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সর্বোপরি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমন্বিত ফল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অদৃশ্য প্যারামিটার হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। গ্যাব্রিয়েল আলমন্ড (Gabriel Almond) ও সিডনি ভারবার (Sydney Verba) নাগরিক সংস্কৃতির তত্ত্ব (Civic Culture Theory) অনুযায়ী, গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন নিয়ম মানা রাজনৈতিক আচরণের অংশ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরও ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর হয়েছিল আদালতের রায়ের মাধ্যমে।
আবার যুক্তরাজ্যে নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধী দলের নেতা প্রকাশ্যে ফলাফল মেনে নেওয়ার যে রীতি, তা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার একটি বড় ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে আমরা দেখি, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা একে অপরের ব্যক্তিগত জীবন, অতীত এবং গোপন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য আক্রমণ করেন। তারপরও সেখানে একটি সহনশীলতার সীমারেখা বিদ্যমান থাকে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলের ভেতরের গণতন্ত্র। প্রাথমিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং নির্বাচনের পর প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি—এসবই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক।
বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের উদাহরণ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী (Secretary of State) হিসেবে দায়িত্ব দেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং গণতান্ত্রিক উদারতার একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
অতএব, সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো একক শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের তত্ত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সর্বোপরি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমন্বিত ফল।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এই উপাদানগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই সমন্বয়ই নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার লড়াই থেকে বের করে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিফলনে রূপ দেয়।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
