সংসদে অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হতে চান ‘মানবিক পুলিশ’ শওকত হোসেন

বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত সদস্য হিসেবে টানা ১৮ বছর দায়িত্ব পালনের পর মানবিকতার টানে নতুন পথে হাঁটছেন শওকত হোসেন। ক্ষমতার মোহ নয়—অসহায়, দুস্থ ও বেওয়ারিশ মানুষের কণ্ঠস্বর হতে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ–কবিরহাট–সদর আংশিক) আসন থেকে জনতার দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কলম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এই মানবিক কর্মী।
মো. শওকত হোসেন নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি মৃত মো. আবুল খায়ের ও মৃত রেজিয়া বেগম দম্পতির সন্তান। তার বাবা মো. আবুল খায়ের ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা।
কর্ণফুলী পেপার মিল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা শেষে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন শওকত হোসেন। ২০০৯ সালে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে রাঙামাটিতে কর্মরত থাকেন। পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির পাশাপাশি মানবিক সেবাকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করতে তিনি তিন বছরের ডিপ্লোমা এবং দুই বছরের প্যারামেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করেন।

২০১১ সাল থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে নীরবে শুরু হয় তার মানবিক কর্মকাণ্ড। নিয়মিত ডিউটির পর শহরের অলিগলি ঘুরে স্বজনহারা, নাম-পরিচয়হীন ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসাসেবা দিতেন তিনি। অনেক সময় নিজের উদ্যোগে ওষুধ সংগ্রহ করে তা অসহায়দের হাতে তুলে দিতেন। তার এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে একসময় একাধিক পুলিশ কনস্টেবল স্বেচ্ছায় যুক্ত হন।
দীর্ঘদিন পুলিশে দায়িত্ব পালনের পর মানবিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণ সময় দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। এরপর মানবিক সহায়তা, চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন শওকত হোসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘মানবিক পুলিশ’ নামে।
শওকত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা ছয় ভাই-বোন। আমার স্বপ্ন সব সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। নির্বাচিত হলে আমি অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হবো। সব রাজনৈতিক দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে চাই। বাংলাদেশে একটি বেওয়ারিশ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা আমার বড় স্বপ্ন।

তিনি আরও বলেন, আমার নিজের একটি ঘরও নেই। আমি ভাইয়ের বাড়িতে থাকি। পচা-গলা মানুষের জন্যই আমি সংসদে যেতে চাই। আমি সংসদ সদস্যের বেতন গ্রহণ করবো না—সব টাকা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করবো। চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকায় আমি একটি বেওয়ারিশ ১২০ শয্যার হাসপাতাল চালু করেছি, যেখানে অসহায় মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। নির্বাচিত হই বা না হই—এই সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তার ভাষ্য, আমার রাজনীতি ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়। এটি আমার মানবিক দায়িত্ব পালনের একটি মাধ্যম। সংসদে গিয়ে বেওয়ারিশ ও অসহায় মানুষের জন্য টেকসই চিকিৎসা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে চাই।
নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ–কবিরহাট–সদর আংশিক) আসনটি একসময় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নির্বাচনী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন তার রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও এবারের নির্বাচনে সেই শূন্যস্থান ঘিরে নতুন মুখদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে ভোটের সমীকরণ।
এবারের নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ আসনে মোট ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আলোচনায় রয়েছেন—বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।

এ ছাড়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, জেএসডি, ইনসানিয়াত বাংলাদেশ, সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি, জনতার দল এবং দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা, কবিরহাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং সদর উপজেলার ২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩ হাজার ৮৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮০ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন। মোট ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের কোনোটিই অস্থায়ী নয়। তবে ৯৮৫টি ভোটকক্ষের মধ্যে ৩৫টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপির ধানের শীষ এবং জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তিতে বিএনপির প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে থাকলেও মাঠপর্যায়ে জামায়াত প্রার্থীর শক্ত অবস্থানও উল্লেখযোগ্য।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মানবিক কর্মকাণ্ড, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি কারণে শওকত হোসেন নোয়াখালী-৫ আসনে একজন সম্ভাবনাময় ও আলোচিত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
হাসিব আল আমিন/এএমকে