উন্নয়ন ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের স্মৃতি রেখে বিদায় নিলেন রমেশ চন্দ্র সেন

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রমেশ চন্দ্র সেন মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় থাকা এই প্রবীণ নেতার প্রয়াণে দল-মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক মহলে শোক ও স্মৃতিচারণের ঢল নেমেছে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টার দিকে দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সকাল সাড়ে ৯টায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
রমেশ চন্দ্র সেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কশালগাঁও গ্রামে ১৯৪০ সালের ৩০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ক্ষিতীন্দ্র মোহন সেন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা বালাশ্বরী সেন গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ব্যক্তিজীবনে তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তার সহধর্মিণী অঞ্জলি রানী সেন (৭৫) বর্তমানে শোকসন্তপ্ত অবস্থায় রয়েছেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬৩ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বি.কম এবং ১৯৬৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কস্ট অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
পড়াশোনা শেষ করে তিনি রুহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি পারিবারিক ধান-চালের ব্যবসার দায়িত্বও পালন করেন। পরবর্তীতে জনসম্পৃক্ত রাজনীতির প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৬৯ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উপনির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবার ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মোট ৫বার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রকল্প ও পানি সম্পদ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি ভূমিকা রাখেন। পরে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন।
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য থাকাকালে ঠাকুরগাঁওয়ের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষিনির্ভর অঞ্চলে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়রা বিশেষভাবে স্মরণ করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অসহযোগ আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারত পালিয়ে গেলে পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। এরপর একই বছরের ১৬ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া এলাকার বাড়ি থেকে রমেশ চন্দ্র সেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর আজ সকালে তিনি দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকার অনেকেই বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকবার্তায় বলেন, রমেশ চন্দ্র সেন দেশের রাজনীতিতে একজন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সহনশীল ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
শনিবার দুপুর ৩টার দিকে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রুহিয়ায় তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতারা জানান, রমেশ চন্দ্র সেন দায়িত্ব পালনকালে সড়ক যোগাযোগ, পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেছেন। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তার আগ্রহ ছিল বলে জানান তারা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে রমেশ চন্দ্র সেনের প্রয়াণ ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে এক যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন অনেকেই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ পথচলা এবং এলাকার সঙ্গে গভীর সংযোগ আগামী দিনেও স্মরণে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এসএইচএ