নোয়াখালী-৪ আসন : এগিয়ে ধানের শীষ, আলোচনায় দাঁড়িপাল্লা

নোয়াখালী-৪ (সদর–সুবর্ণচর) আসনটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ভোটারসংখ্যায় বড় একটি আসন। রাজনৈতিকভাবে এই আসন বরাবরই আলোচিত। এবারের নির্বাচনে এখানে অভিজ্ঞ রাজনীতিক বনাম পরিবর্তনমুখী রাজনীতির লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং সুবর্ণচর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৭ লাখ ৩৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৬ জন এবং নারী ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৭৯ জন। মোট ১৯৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে একটিও নেই অস্থায়ী কেন্দ্র। তবে আছে ১৩৬৬টি ভোট কক্ষের মধ্যে ৪৪টি অস্থায়ী ভোট কক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ৪২টি।
নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৭ জন প্রার্থী। তারা হলেন, বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহজাহান, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. ইসহাক খন্দকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাত পাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. ফিরোজ আলম মাসুদ, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী আবদুজ জাহের, জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মো. শরীফুল ইসলাম, ইনসানিয়াত বাংলাদেশ মনোনীত আপেল প্রতীকের প্রার্থী মো. ইউনুস নবী ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মনোনীত কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী বিটুল চন্দ্র মজুমদার।
ভোটকেন্দ্র ও অবকাঠামোগত দিক থেকে আসনটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও বিশাল ভোটার সংখ্যার কারণে এখানে প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি এই আসনে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানকে। তিনি ইতোপূর্বে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে এমপি ছিলেন।
রাজনৈতিক অঙ্গণে তিনি একজন পরিচ্ছন্ন ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। মনোনয়ন ঘোষণার আগে একাধিক প্রত্যাশী থাকলেও পরে কোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ দৃশ্যমান হয়নি। মনোনয়ন ঘোষণার আগেই তিনি ও তার সমর্থকরা এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেন, যা নির্বাচনী মাঠে তাকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মো. শাহজাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি কখনো নিজের স্বার্থ দেখেনি। সবসময় সদর ও সুবর্ণচরের মানুষের পাশে ছিলাম। সে কারণেই দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমি মিথ্যা আশ্বাস আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে পছন্দ করি না। তবে আমি মানুষের কথা ভাবি। উন্নয়ন নিয়ে ভাবি। আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে এই অঞ্চলের চিত্র। জনগণ আমার শক্তি। আমি সব সময় জনগণের পাশে থাকতে চাই।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইসহাক খন্দকার। জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই তিনি মাঠে সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইসহাক খন্দকার দাবি করেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করছেন। তার ভাষায়, কে কোন দল থেকে প্রার্থী এটা মুখ্য নয়, মানুষ এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চায়। আদর্শিক রাজনীতি ও পরিবর্তনের স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী আব্দুজ জাহের, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফিরোজ আলম মাসুদসহ অন্য প্রার্থীরাও নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। তবে ভোটের মূল লড়াই যে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে সে বিষয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক একমত।
সাধারণ ভোটারদের ভাষ্যে, ইপিজেড নির্মাণ, বিমানবন্দর স্থাপন, সুবর্ণচর পৌরসভা বাস্তবায়ন, রেললাইন সম্প্রসারণ ও নোয়াখালী সিটি করপোরেশন গঠনের মতো বড় প্রকল্পগুলোই তাদের প্রধান চাওয়া। তারা কেবল আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন করতে পারবেন—এমন প্রতিনিধিকেই সংসদে পাঠাতে চান।
সব মিলিয়ে নোয়াখালী-৪ আসনে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বনাম পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি লড়াই। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে থাকা মো. শাহজাহানের বিপরীতে আদর্শিক ও পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে মাঠে সক্রিয় ইসহাক খন্দকার কার দিকে শেষ পর্যন্ত ভোটাররা আস্থা রাখেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
হাসিব আল আমিন/আরকে