খাগড়াছড়িতে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি, সমীকরণ বদলে দিতে পারে জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। পাহাড়ি-বাঙালি অধ্যুষিত এই আসনে ভোটের লড়াই জমে উঠেছে, শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র চলছে ভেটের হিসাব-নিকাশ। ভোটারদের মন জয়ে উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
এবারের নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে পাহাড়ি ভোটের বিভাজন বিএনপির জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয়তা নির্বাচনের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এ আসনে ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা এবং বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সমীরণ দেওয়ানের মধ্যে মূলত পাহাড়ি ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুইঁয়ার জন্য পথ কিছুটা সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনের শুরুতে পাহাড়ি সচেতন নাগরিক সমাজ একক পাহাড়ি প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নে প্রাথমিক যাচাইয়ে ধর্ম জ্যোতি চাকমা চূড়ান্ত হলেও আপিল প্রক্রিয়ায় সমীরণ দেওয়ান টিকে গেলে পুরো নির্বাচনি সমীকরণ বদলে যায়। দুইজন শক্তিশালী পাহাড়ি প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা প্রকট হয়ে ওঠে।
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় দিনরাত গ্রাম, পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। দুর্গম এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং যুব কর্মসংস্থান এই বিষয়গুলোই উঠে আসছে প্রচারণার মূল বক্তব্যে।
মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, আগামীতে যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন জেলার দুর্গম এলাকাগুলোর যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেন এটাই তার প্রত্যাশা।
কমলছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা প্লানোচিং মারমা বলেন, খাগড়াছড়ি জেলার প্রধান সমস্যা হলো সাম্প্রদায়িকতা। আগামীর নির্বাচিত সংসদ সদস্য যেন অসাম্প্রদায়িক হন এটাই তার আহ্বান। যে কোনো বিপদে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থী মণি ত্রিপুরা এবছর প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তিনি বলেন, আগামীর নির্বাচিত সংসদ সদস্য যেন পার্বত্য এ জেলার পিছিয়ে থাকা শিক্ষাখাতে উন্নয়নে কাজ করেন। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি যুবকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এমনটাই তার প্রত্যাশা।
খাগড়াছড়ি জেলায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, দেশের অনেক জায়গায় যেখানে দলীয় কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি, সেখানে এই জেলায় বিএনপি প্রতিটি আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায়, জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী দলটি।
খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, জেলায় দলের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি রয়েছে, যেখানে প্রায় দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মী সক্রিয়। তবে তার শঙ্কা, জেলার ২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে শতাধিক কেন্দ্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সেনাবাহিনী ছাড়া স্বাভাবিক ভোটগ্রহণ সম্ভব নয়। ভোটের অন্তত দুই দিন আগে থেকে সেনাবাহিনীকে কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নিতে হবে, যাতে অবৈধ অস্ত্রধারীরা কোনোভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
এর আগে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির প্রার্থী ওয়াদুদ ভুঁইয়াসহ চারজন খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে শতাধিক ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটের অন্তত দুই দিন আগে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাসহ মোতায়েনের দাবি জানান।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি শহরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক শোডাউন করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা। জেলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েক হাজার নারী-পুরুষ এতে অংশ নেন। তিনি এ নির্বাচনে ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) সমর্থিত প্রার্থী। ৮ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
ধর্মজ্যোতি চাকমা জানান, প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে তাকে বিজয়ী করবে। তিনি বলেন, বাধাহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাঝেমধ্যে অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হুমকি পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভোটের মাঠে আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সমীরণ দেওয়ান। তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় গত ১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
সমীরণ দেওয়ান বলেন, নির্বাচিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন। তার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক একটি সংগঠনের সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি এ এলাকার জনগণের মনোনীত প্রার্থী।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো খাগড়াছড়িতেও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দলটির পক্ষ থেকে এবার নতুন মুখ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী চৌধুরী সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন। ভোটের মাঠে তিনি বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর খাগড়াছড়ি জেলা সেক্রেটারি মিনহাজুর রহমান বলেন, এবার মানুষ ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশ গড়তে চান। প্রতীক নয়, সৎ ও যোগ্য নাগরিক বিবেচনা করেই ভোট দেবেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনকে আরও সতর্ক ভূমিকা রাখতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক দল কোনোকোনো জায়গায় নিজেদের এলাকা দাবি করে ভোটের আগেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক প্রিসাইডিং অফিসাররা যেন প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের অভিযোগ গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন।
খাগড়াছড়ির রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন থাকবে। এখন পর্যন্ত জেলায় নির্বাচন কেন্দ্রিক কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি। জাতীয় সংসদের ২৯৮নং আসন খাগড়াছড়িতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন।
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটের পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকবে, তা জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন খাগড়াছড়ির ভোটাররা। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে জেলা এগিয়ে নেন।
মোহাম্মদ শাহজাহান/আরকে