ইউএনওর বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, তদন্তে দুদক

রংপুরের পীরগাছায় সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ টিম। দুদকের উপপরিচালক (ডিডি) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি টিম এ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে, বৃহস্পতিবার দুপুরে শল্লার বিল সরেজমিনে পরিদর্শন করে তদন্ত টিম।
সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও পিআইও আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে টেকনিক্যাল টিমসহ বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সহযোগিতার জন্য অভিযুক্ত সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও পিআইও আব্দুল আজিজকে ডাকা হয়েছিল। তবে নাজমুল হক সুমন উপস্থিত ছিলেন না।
এর আগে, গত বছরে ‘পীরগাছায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতি, ইউএনওর ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ’ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এর প্রেক্ষিতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তর নড়েচড়ে বসে।
গত বছরের ৩ জুলাই দুদক রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল শল্লারবিল আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় অভিযান চালায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ঠাকুরগাঁয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত থাকার সুবাদে তদন্ত বন্ধে তার দেনদরবার অব্যাহত রেখেছেন। তবে এর আগে, সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও জেলা প্রশাসন অভিযোগের বিষয়ে পৃথকভাবে তদন্ত করলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের শল্লার বিলে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ৪৩০টি ঘর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুরু থেকে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বর্তমানে ঠাকারগাঁও জেলার এডিসি নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
গত ৫ আগস্টের পরেও আওয়ামী লীগের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনসির একান্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত নাজমুল হক সুমন সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অনিয়ম চালিয়ে যান। এতে তাকে সহযোগিতা করেন অন্নদানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান সংগ্রাম। তার মাধ্যমে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নাগরিক সুবিধা ছাড়াই শল্লারবিলে দায়সারাভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪৩০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। পুনর্বাসিতদের জন্য নাগরিক সেবা কমিউনিটি সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থান, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মক্তব, খেলার মাঠ ও অভ্যন্তরীণ রাস্তাসহ কিছুই নেই।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় ৪৩০টি ঘর নির্মাণের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে পীরগাছায়। প্রতি ঘর তৈরিতে বরাদ্দ হয় ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা। প্রথম অবস্থায় ১১০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাকি ৩২০টি ঘর নির্মাণ শুরু হয়। প্রতিঘর থেকে নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ টাকা করে মোট ৪ কোটি ৩০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পটির ৩২০টি ঘর নির্মাণকাজ শুরুর আগে সেখানে ৫-৬ ফুট উঁচু করে মাটি ভরাটের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৫৬৬ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাবিখা প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে মাটি ভরাটের নিয়ম থাকলেও করা হয়েছে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে। তবে দেড় থেকে তিন ফুট উঁচু করা হয়েছে। যা বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনোভাবেই ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। এর পরেও তারা আশ্রয়ণ প্রকল্পকে ঝুঁকিতে ফেলে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ইউএনওসহ সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া, প্রকল্পস্থলে ড্রেজার মেশিন দিয়ে গভীর খনন করে অতিরিক্ত মাটি কেটে জমিয়ে রাখা হয়। পরে প্রায় ৪ কোটি টাকার মাটি বাইরে বিক্রি করেন ইউএনও নাজমুল হক সুমন। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে ভাঙন কাছাকাছি চলে এসেছে। এরই মধ্যে তাসনিম ও কহিনুর বেগমসহ চারজন মৃত্যুবরণ করেছেন। যাদেরকে প্রকল্প সীমানার বাইরে দাফন করা হয়েছে। অনেকের কবুলিয়ত সম্পাদন হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ৪০০ বর্গফুট আয়তনের ২ কক্ষবিশিষ্ট সেমিপাকা একক ঘর নেই।
প্রকল্পটিতে করা হয়েছে বহুমুখী অনিয়মের মাধ্যমে। পানীয়জলের সমস্যায় ভুগছে আশ্রিতরা। ১০টি পরিবার মিলে একটি নলকূপের পানি পান করতে হচ্ছে। এ ছাড়া, ঘর বরাদ্দে সুবিধাভোগীদের কাছে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে ইউএনওর বিশেষ টোকেন ব্যবহার করা হয়েছে। এখান থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় সাবেক ইউএনও।
এদিকে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় প্রকল্পের কাজ না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও পিআইও আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে অসংখ্য প্রকল্প প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলেও ‘কাজ শেষ হয়েছে’ দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে। বরাদ্দের টাকার বেশির ভাগ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি স্থানীয় লোকজন এসব প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানেন না।
জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িতদের যোগসাজশে একের পর এক বরাদ্দ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, নাজমুল হক সুমন পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকে সরকারি পরিপত্র ও আদালতের আদেশ অমান্য করে তৎকালীন সরকার দলীয় নেতাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন। এমনকি নিজে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পরেও পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন তিনি।
শুধু তাই নয়, গত সরকারের সময় দলীয় প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়ে তিনি নিজে ফায়দা লুটিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষবাণিজ্য ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের পুরো টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস ছালাম বলেন, 'ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও ইউএনও মিলে কোটি কোটি টাকা মেরে খেয়েছে। এসব দুর্নীতির তদন্ত পূর্বক বিচার করতে হবে।
অবিলম্বে দুর্নীতির তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, সরকার কি এসব দেখেও নীরব থাকবে। জনগণের টাকা লুটকারীদের কি বিচার হবে না।
ইউএনও নাজমুল হক সুমনের বদলির আগেই অফিস সহকারী রেজাউল করিমকে বদলি করা হয়। কিন্তু নাজমুল হক সুমনের বদলির পরেও প্রায় দেড় মাস রাতে নিয়মিত অফিস করেন রেজাউল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ইউএনওর দুর্নীতির ফাইল ঠিক করতেই রাতের আধারে নিয়মিত অফিস করেছেন অফিস সহকারী রেজাউল করিম।
পীরগাছার তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, প্রকল্পগুলো ইউএনও নাজমুল হক সুমনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, ওই সময় আমি এখানে কর্মরত ছিলাম না। আমি পরে এখানে এসেছি।
অভিযুক্ত পীরগাছার সাবেক ইউএনও ও ঠাকুরগাঁও জেলার এডিসি নাজমুল হক সুমনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বর্তমান ইউএনও দেবাশীষ বসাক বলেন, অভিযোগের বিষয় তদন্তে বৃহস্পতিবার পীরগাছায় দুদকের একটি টিম এসেছিল।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে