রংপুরে ভর্তুকির সার বেশি মূল্যে বিক্রি, একাধিক ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত

রংপুরের পীরগঞ্জে বিসিআইসির সার ডিলাররা ভর্তুকি মূল্যে আমদানিকৃত ডিএপি সার খুচরা বিক্রেতা ও কৃষকদের মাঝে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি উপজেলা কৃষি বিভাগের নজরে এলে সারের মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এক ডিলারের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসেছে।
চলতি মাসের গত ৫ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়টির সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমামের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের শূন্য ডিলার ইউনিটের তালিকা পাওয়া গেছে। ওই সব শূন্য ইউনিটে নীতিমালা মোতাবেক সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ডিলার নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে ফরমও প্রকাশ করে ‘BRRI Rice Museum’ ফেসবুক পেজে আপলোড দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়মে ডিলার নিয়োগের খবরে অসৎ ডিলার এবং খুচরা সার ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ প্রতিমাসেই ভুর্তুকির মূল্যের আমদানিকৃত প্রতি বস্তা ডিএপি সারে অধিকাংশ ডিলার ২শ টাকার ওপরে বিক্রি করে আসছে।
অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির বিষয়টি উপজেলা কৃষি অফিসার সুমন আহমেদ জানার পরই মনিটরিং জোরদার করেছেন। পাশাপাশি তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর আহমেদকে নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের বিসিআইসির সার ডিলার ‘মেসার্স সোনালী ভান্ডার’কে ২৯ জানুয়ারি ১৫ হাজার টাকা জরিমানাও করেন। ইতোপূর্বেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বেশ কয়েকজন ডিলারের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। তারপরও অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি থামছে না।
উপজেলার বড় আলমপুর ইউনিয়নের বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স তৃপ্তি ট্রেডার্সের মালিক তোজাম্মেল হক দুদুর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কৃষকরা তার কাছে সার কিনতে গেলে ভাইভা পরীক্ষা নেন। ফলে কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খুচরা সার ব্যবসায়ী ও সাধারণ কৃষকরা নাম না প্রকাশ করে জানান, ইউনিয়নগুলোর ওয়ার্ড পর্যায়ে বিসিআইসির একাধিক সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলে সারের অতিরিক্ত মূল্যের ভোগান্তি কমবে। পাশাপাশি সার পাওয়াও সহজ হবে বলে টুকুরিয়া ইউনিয়নের জনমপুরের শফিকুল ইসলাম, কুমেদপুর ইউনিয়নের বারুদহ গ্রামের খলিলুর রহমান, বড় আলমপুর ইউনিয়নের উজিরপুরের বেলাল মিয়া, মিঠিপুর ইউনিয়নের কুতুবপুরের মফিজুল ইসলামসহ অসংখ্য কৃষক জানান।
খালাশপীর হাটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে বিসিআইসি'র সার ডিলার হওয়ায় অনেক অসাধু ডিলার রাসায়নিক সার (ভূর্তির আমদানিকৃত ও দেশেই উৎপাদিত) অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করে। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেশি হয়। তাই প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক সার ডিলার নিয়োগ করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খালাশপীর হাটের একজন বিএডিসির ডিলার বলেন, সাধারণ কৃষকরা কিছু রাসায়নিক সার আমাদের কাছে কিনতে আসেন, কিন্তু আমরা সেই সার বরাদ্দই পাই না। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ আমাদেরকেও বিসিআইসি ডিলারের বরাদ্দকৃত সার দেওয়া হোক। পাশাপাশি ফসলের চাষাবাদ নির্বিঘ্ন করতে আরও ডিলার নিয়োগ দেয়া হোক।
বিসিআইসির সার ডিলার নিয়োগের বিরোধিতা করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার বলেন, ওয়ার্ডপর্যায়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলেও সার বিক্রির কমিশন বাড়ানো হবে না। তাই আমরা বিএফএ এর মাধ্যমে আগের নীতিমালার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছি।
উপজেলা কৃষি অফিসার সুমন আহমেদ বলেন, সরকার কৃষকদের মাঝে সুষমভাবে সার পৌঁছাতে ওয়ার্ড পর্যায়ে সার ডিলার নিয়োগ করলে অন্ততপক্ষে আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারব। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে তাদের হাতের নাগালে সার পাবেন বলে আশা করি। ২০২৫ সালের সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছে যাবে।
উল্লেখ্য, বিসিআইসি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ডিলাররা ব্যবসা করে আসছেন। সরকার কৃষকদের স্বার্থে নতুন ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে গেলেই তাদের গঠিত বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) এর কেন্দ্রীয় কমিটি মহামান্য হাইকোর্টে মামলা করে আটকে দেয়। আর অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি করে আসছে। এভাবে বছরের পর বছর ধরেই সারাদেশের ডিলাররা এমন ঘটনা ঘটিয়ে কৃষকদের হাড্ডি মজ্জা চুষে খাচ্ছে বলে জানা গেছে। তাই নতুন নীতিমালায় সার ডিলার নিয়োগ করে কৃষকদের সার সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষার জন্য বিএডিসি, সৎ খুচরা সার ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা দাবি জানান।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরকে