ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জনকে তোয়াক্কা করেন না স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

একাধিকবার বদলির আদেশ জারি হলেও তা কার্যকর না করে এখনো আগের কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল আহমেদ। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে তিনি পীরগঞ্জেই বহাল থাকায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত এক আদেশে ডা. কামাল আহমেদকে পার্শ্ববর্তী রানীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে বদলি করা হয়। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল ৫ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে, অন্যথায় ষষ্ঠ কর্মদিবসে তাকে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে।
কিন্তু আদেশ জারির ৪১ কার্যদিবস পার হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে তিনি পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই অবস্থান করছেন এবং নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ অবস্থায় ১৯ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. মো. আনিছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পুনরায় তাকে ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরপূর্বক রানীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে তিনি পূর্বে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। নির্বাচন শেষ হওয়ায় আর কোনো বাধা নেই এমন প্রেক্ষাপটে দ্রুত নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু ২২ ফেব্রুয়ারি পার হলেও তিনি যোগদান না করায় একই দিনে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে আবারও নোটিশ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, দায়িত্ব হস্তান্তর না করে এবং সিভিল সার্জনকে অবহিত না করে তিনি ই-মেইলের মাধ্যমে নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করেছেন, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবজ্ঞা করা এবং চাকরি বিধির পরিপন্থী। তার নৈমিত্তিক ছুটি নামঞ্জুর করে অতিসত্তর দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, পীরগঞ্জে কর্মরত থাকতেই ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদের কাছ থেকে একটি ডিও লেটার সংগ্রহ করেছেন ডা. কামাল আহমেদ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বদলি আদেশ স্থগিত বা কার্যকর বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. কামাল আহমেদ ডিও লেটার নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বদলিকৃত কর্মস্থল রানীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সময়মতো যোগদান করতে পারেননি। তবে দুই-এক দিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবেন বলে জানান।
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি বদলির আদেশ অমান্য করেও একজন কর্মকর্তা কীভাবে দায়িত্বে বহাল থাকেন? প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আনা হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ডা. কামাল আহমেদের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, পীরগঞ্জেই তার বাড়ি হওয়ায় নিজ বাসায় ‘কেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অফিস সময়েই ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা রোগীদের সেখানে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক আচরণ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া গত বছরের ১ ডিসেম্বর হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ আরমিনা আক্তারকে হয়রানিমূলকভাবে বদলি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে ২৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য বিভাগ ওই বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে আগের কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশ পাওয়ার পরও ডা. কামাল আহমেদ তার যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এখনো কার্যত কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না হয়েও প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি ও অনুমোদনহীন ক্লিনিকে সিজারসহ অপারেশন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তাছবীর হোসেন বলেন, বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক দায়িত্ব। তবে সরকারি নির্দেশ অমান্য করা হলে তা অবশ্যই শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল। বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশ এলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা বদলির আদেশ অনুযায়ী ডা. কামাল আহমেদকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দপ্তর থেকে একাধিকবার লিখিতভাবে তাকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো তিনি যোগদান না করায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী বদলির আদেশ অমান্য করার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর ও যোগদান না করলে তা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রেদওয়ান মিলন/আরকে