‘পানের বরজ পুড়ে আমাদের ঈদটা মাটি হয়ে গেল’

‘পানের বরজ পুড়ে আমাদের ঈদটা মাটি হয়ে গেল। এবার ঈদে আমরা কিছু কেনকাটা করতে পারবো না। এই পান আমাদের সম্বল ছিল।’
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহীর দুর্গাপুরে আগুনে পুড়ে যাওয়া পানের বরজ দেখতে এসে এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গৃহবধূ মেহেরুন নেসা। মেহেরুন নেসা আগুনে পুড়ে যাওয়া পানের বরজের মালিক নজরুল ইসলামের পুত্রবধূ।
মেহেরুন নেসা বলেন, এই পানই আমাদের জীবন-জীবিকার উৎস। বেশ কয়েক মাস ধরে পানের দাম ছিল না। কিছুদিন থেকে পানের দাম বেড়েছে। তাই যত্ন করে রেখেছিলাম। পান বিক্রি করে বাজার করব বলে। ঈদের কেনাকাটায় পান আমাদের একমাত্র সম্বল ছিল। এই ঈদে ছেলে-মেয়েদের কেনাকাটা করাব সামর্থ্য থাকলো না আমাদের।
এর আগে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের পারিলা গ্রামের বাগমারা বিলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে দুটি বরজের পান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, আগুনে বেশি ক্ষতি হয়েছে উপজেলার রসুলপুর এলাকার নজরুল ইসলামের। কম ক্ষতি হয়েছে পারিলা গ্রামের গোলাম নবীর। তাদের দুজনের জমির মধ্যে দেড়শ গজ দূরত্ব। তাদের দুজনের জমির মাঝে পতিত ফাঁকা জায়গা। এছাড়া তাদের জমির আশপাশে বৈদ্যুতিক কোনো তার নেই। তারপরও দুজনের পানের বরজ আগুনে পুড়েছে।
তবে নজরুল ও গোলাম নবীর পানের বরজের পতিত ফাঁকা জায়গায় খনন করা হচ্ছে পুকুর। সেই পুকুর খনন নজরুলের জমির কাছাকাছি চলে এসেছে। এছাড়া যেখানে পুকুর খনন করা হচ্ছে সেই জমিগুলো বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপের আওতাধীন। এই জমির মধ্যে বিএমডিএর বেশ কিছু সেচ দেওয়া পয়েন্ট রয়েছে। সেখানে পুকুর খনন সম্পন্ন হলে একদিকে সেচ পয়েন্ট নষ্ট হবে, অন্যদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এছাড়াও ফসলি জমিতে পুকুর খননে জমি দিতে অস্বীকৃতি জানান নজরুল ইসলামসহ একাধিক পান চাষি।
ক্ষতিগ্রস্ত পান চাষিদের দাবি- পুকুর খননে জমি নিতে পানের বরজে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এতে যেন বাধ্য হয়ে পান চাষিরা পুকুর খনন করতে দেয় তাদের।
নজরুল ইসলামের ছেলে মিলন আলী বলেন, গত কয়েকদিন আগে আমার আব্বাকে বলে পুকুর খনন করব। স্থানীয় এক ব্যক্তি তাকে (আব্বা) জানিয়েছেন- পুকুর খনন হলে প্রতি বিঘায় ৩৬ হাজার টাকা দেওয়া হবে জমির মালিককে। তখন আব্বা (নজরুল) জমি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় বলে আমার এতটুকুই জমি শেষ সম্বল। আমি ভ্যান চালিয়ে খাই। এই জমিটুকু দিলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে। আমি দেব না। পানের বরজ থাকলে আমি প্রতিদিন টাকা পাবো। পুকুর খনন হলে তা পাব না।
তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কথা হয়েছে। আর রাতে আগুন লেগেছে পানের বরজে। শুধু আমরাই না- এই বিলের অনেকেই পুকুর খননে একমত নয়। প্রভাবশালী লোকজন পুকুর খনন করবে বলে বিএমডিএ’র গভীর নলকূপ চালিয়ে ধান চাষ করতে দেয়নি জমির মালিকদের। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার চাই।
আগুনে পোড়া পানের বরজ দেখতে আসছেন আশপাশের এলাকার নারী-পুরুষেরা। এ সময় কথা হয় মেহের আলী শাহের সঙ্গে। তিনি বলেন, পানের বরজের ওপর বিদ্যুতের তার বা আশপাশে ঘরবাড়ি নেই। তাহলে আগুন কোথা থেকে আসলো? কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুন লাগে রাতে, তখন এই পানের বরজে কোনো শ্রমিক কাজও করছিল না যে অসাবধানতাবশত আগুন লেগেছে। আমি শুনেছি পুকুর খননের জন্য জমি চেয়েছিল, দেয়নি তারা।
তবে এই ঘটনা এখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্গাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার মনে হয় ইন্টারনাল কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিভিন্ন প্রকারের আর কি, স্পেসিফিক কিছু বলা যাবে না।
তিনি বলেন, পুকুর খনন হচ্ছে না। পুকুর খননের চেষ্টা করা হয়েছিল সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ভেকু (এক্সকেভেটার) পড়ে রয়েছে। ভেকুটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। পুকুর খনন নিয়ে সমস্যা এটা আমার কাছে মনে হয়নি। তবে সেখানে গ্রামভিত্তিক কিছু দ্বন্দ্বের বিষয় রয়েছে, সেগুলোর কারণে হতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভিন লাভলী বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানে দুইজন কৃষকের প্রায় ২০ শতক জমির পানের বরজ পুড়ে গেছে। আমরা রিপোর্ট পাঠাবো।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসতুরা আমিনা বলেন, আজকে ভুক্তভোগীরা এসে দেখা করেছিলেন। তারা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি থানায় বলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা থানায় গেলে মামলা নেবে পুলিশ।
শাহিনুল আশিক/আরএআর