হাজার কোটি টাকা খরচে সেচ ক্যানেল, তবুও পানি পাচ্ছে না কৃষক

নীলফামারীর ডালিয়ায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ঘিরে হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও পানির অভাবে তা এখন নামসর্বস্ব প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। উজানের একতরফা পানি প্রত্যাহারে উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা এখন মরণদশায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিপত্রে সেচের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দাবি করা হলেও বাস্তবে মাঠজুড়ে এখন ধু ধু বালুচর। খালের অবকাঠামো সেচ ক্যানেল থাকলেও নেই পানি। ফলে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের লাখো কৃষক এখন বিকল্প সেচ ব্যবস্থারের ওপর নির্ভর হয়ে গুণছেন বাড়তি খরচ।
তিস্তা নদীর বুকজুড়ে এখন শুধু বালুর স্তূপ । বর্ষা মৌসুমে যেখানে পানিপ্রবাহ গড়ে ২ লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়, তবে শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে মাত্র ২ হাজার কিউসেকে। ডালিয়া পয়েন্টে কখনও কখনও এই প্রবাহ ৫০০ কিউসেকের নিচেও নেমে আসছে।
তিস্তা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, নদীর উজানে ভারত অংশে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ অংশে পানির এই হাহাকার তৈরি হয়েছে। নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে তিস্তা সেচ প্রকল্পে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলেও মূল উৎস নদীতে পানি না থাকায় কৃষকদের কোনো কাজেই আসছে না এসব কোটি টাকার সেচ ক্যানেল।
তিস্তা ব্যারেজ থেকে শুরু হওয়া সেচ প্রকল্পের ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খালগুলো নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই খালগুলোর সম্প্রসারণ করার কাজ চলছে, যার ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। তবে নতুন স্লুইস গেট ও পাকা ক্যানেল তৈরি হলেও সেখানে আজ পর্যন্ত একবারও তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। প্রকল্পের আওতাধীন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক এখন বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো পানি না পাওয়ায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উত্তরের কৃষকদের বাড়ছে চাষাবাদে খরচ।
১৯৯০ সালে যখন তিস্তা সেচ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়, তখন সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমি। কিন্তু গত তিন দশকেও সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। চলতি ২০২৫ ও ২৬ মৌসুমে সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে মাঠের চিত্র বলছে বর্তমানে যে পরিমাণ পানি প্রবাহ রয়েছে তাতে ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়াও এখন অসম্ভব।

নীলফামারীর দারোয়ানী এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, নদীর পানি পেলে আমাদের বিঘা প্রতি খরচ হতো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এখন শ্যালো মেশিনে ডিজেল পুড়িয়ে খরচ হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। সারের দাম বেশি, তেলের দাম বেশি, আবার পানির জন্যও বাড়তি টাকা।
আরেক কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, সেচ দেওয়ার জন্য ক্যানেলসহ সবকিছু ঠিক করা হয়েছে তবে পানি পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখছি ক্যানেল সংস্কার করা হচ্ছে তবে পানি পাই না।
আরেক কৃষক হাসান আলী বলেন, তিস্তা ক্যানেলে পানি পেয়ে আমরা চাষাবাদ করার স্বপ্ন দেখলেও পানি পাই না। বিকল্প সেচ ব্যবহার করায় দ্বিগুণ খরচে চাষাবাদ করতে হয়। সরকার যদি দৃষ্টি দেয় ক্যানেলে পানি দেয় তাহলে আমরা চাষাবাদ করতে পারব।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সোহেল হাসান বলেন, তিস্তা সেচ প্রকল্পকে কার্যকর করতে হলে কেবল ক্যানেল খনন বা অবকাঠামো উন্নয়ন করলে হবে না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে বিকল্প হিসেবে বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রাখার জন্য 'রিজার্ভার' বা জলাধার তৈরির পরিকল্পনা নিতে হবে। অন্যথায় হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ বালুচরেই ঢাকা পড়ে থাকবে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি বলেন, ব্যারাজের উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে ব্যারাজের ভাটিতে ১১০ কিলোমিটার এলাকায় ২০০ কিউসেক পানিও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় ক্যানেলে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শাহজাহান ইসলাম লেলিন/এএমকে