ফেলে দেওয়া মাছের আঁশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়

একসময় বাজারে ফেলে দেওয়া হতো মাছের আঁশ। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের কারণ হওয়া সেই উচ্ছিষ্ট এখন কুড়িগ্রামে রপ্তানি পণ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—সব মিলিয়ে মাছের আঁশ এখন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
জেলার বিভিন্ন মাছ বাজারে রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্প ও ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ কাটার পর যে আঁশ ফেলে দেওয়া হতো, এখন তা সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। বড় মাছের আঁশ সংগ্রহের পর সেগুলো ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। বছরে দুই থেকে তিনবার এসব শুকনা আঁশ পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি মণ কাঁচা আঁশ কিনতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। শুকানোর পর এক মণ থেকে প্রায় এক কেজি আঁশ পাওয়া যায়, যা কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়। বছরে কয়েকশ মণ আঁশ রপ্তানি করে লাখ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে জানান তারা।
রাজারহাট উপজেলার ব্যবসায়ী সুনীল চন্দ্র ও দীলিপ কুমার বলেন, আগে মাছের আঁশ ফেলে দিতাম। গত বছর থেকে ব্যবসা শুরু করেছি। এখন প্রতিদিন আঁশ সংগ্রহ করে শুকিয়ে বছরে দুই-তিনবার বিক্রি করি। এতে বাড়তি আয় হচ্ছে।
খলিলগঞ্জ বাজারের পূর্ণ চন্দ্র দাস জানান, বড় মাছের আঁশ বেশি সংগ্রহ করি। মাসে ২০-৩০ কেজি পর্যন্ত আঁশ হয়। এগুলো পরিষ্কার করে শুকিয়ে ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামের পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। শুধু আঁশ নয়, মাছের নাড়িভুঁড়ি, ফুলকা, পাকনা ও অন্যান্য অংশও বিক্রি হচ্ছে। এসব অংশ মাছের খাদ্য ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মাছ কাটা শ্রমিক সজিব বলেন, আগে আঁশ ফেলে দিতাম। এখন মহাজনের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছি।
মাছের আঁশে প্রচুর পরিমাণে কোলাজেন থাকায় তা খাদ্য, ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, কসমেটিকস ও ক্যাপসুল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও ব্যাটারি, কৃত্রিম কর্নিয়া, বায়ো-পাইজোইলেকট্রিক ন্যানো জেনারেটর ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যে এর ব্যবহার রয়েছে। জাপান, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এসব আঁশ রপ্তানি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ উদ্যোগে সহায়তা দিচ্ছে আরডিআরএস বাংলাদেশ। সংস্থাটির এগ্রিকালচার বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মশিউর রহমান বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে জেলার দুটি উপজেলায় ছয়জন মৎস্যজীবীকে পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন–এর সহযোগিতায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সদস্যদের মাধ্যমে আঁশ সংগ্রহ করে পাইকারের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এটি জেলার অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, মাছের আঁশ রাসায়নিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং পরিবেশ দূষণও কমাচ্ছে। সম্ভাবনাময় এই খাত ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্পে পরিণত হতে পারে। গুণগত মান বজায় রাখতে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে।
স্থানীয়দের মতে, ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টকে সম্পদে রূপান্তরের এ উদ্যোগ কুড়িগ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে মাছের আঁশ শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে।
মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ