চামড়ার কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন চর্মকাররা

মাগুরার শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় চর্মকার সম্প্রদায়ের প্রধান জীবিকা ছিল চামড়ার কাজ। গরু-ছাগলের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, জুতা-স্যান্ডেল সেলাই ও মেরামত এবং চামড়াজাত নানা পণ্য তৈরি করেই চলত তাদের সংসার। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই পৈতৃক পেশা এখন অস্তিত্ব সংকটে। বাজার সংকট, আয়ের স্বল্পতা, আধুনিক পণ্যের দাপট এবং সামাজিক মর্যাদার অভাবে একে একে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন চর্মকার পরিবারের সদস্যরা।
জানা গেছে , একসময় গ্রামাঞ্চলে চামড়ার কাজের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের মৌসুমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে চর্মকারদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। বছরের অন্যান্য সময়েও জুতা-স্যান্ডেল মেরামত ও চামড়াজাত সামগ্রী তৈরি করে মোটামুটি আয় হতো।
কিন্তু বর্তমানে কারখানায় তৈরি সস্তা জুতা-স্যান্ডেল সহজলভ্য হওয়ায় গ্রাহকরা আর আগের মতো মেরামতের কাজে আগ্রহ দেখান না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও ক্রেতার সংকট। ফলে চামড়ার কাজ আর লাভজনক পেশা হিসেবে টিকে নেই।
শালিখার নিতাই বিশ্বাস, অজিত বিশ্বাসসহ একাধিক চর্মকার জানান, একসময় এই পেশা দিয়েই পরিবার চালানো সম্ভব ছিল। এখন দিন দিন কাজ কমে যাচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে দিনমজুরি, ভ্যান চালানো, সেলুনে কাজ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ আবার জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
চর্মকার সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, এই পেশা শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি তাদের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তরুণরা তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ও বেশি আয়ের পেশার দিকে ঝুঁকছে। এতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতা।
আড়পাড়া বাজারর চর্মকার বিকম বলেন, এক দশক আগেও মানুষ সুতা বা স্যান্ডেল সেলাই ও রং করাতে নিয়মিত আসত। এখন অধিকাংশ মানুষ পুরোনো জুতা মেরামত না করে নতুন জুতা কিনে নেয়। এতে তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
একই বাজারের চর্মকার অজিত বিশ্বাস জানান, একজোড়া জুতা সেলাই করতে ৫০ টাকা, রং করতে ৩০ টাকা এবং স্যান্ডেল বাঁধতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এতে দিনে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব। তাই অনেকেই বেত-বাঁশ শিল্প বা ঢুলির কাজের মতো বিকল্প পেশা বেছে নিচ্ছেন।
নিতাই বিশ্বাস নামে আরেক চর্মকার বলেন, আগে তিনি জুতা-স্যান্ডেল সেলাই ও রংয়ের কাজ করতেন। কিন্তু কালি ও ক্রিমের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রেতা কমে যাওয়ায় পৈতৃক পেশা ছেড়ে এখন বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, ডালা ও কুলা বিক্রি করছেন। এতে তুলনামূলকভাবে ভালো আয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যথাযথ প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চামড়াশিল্প ও চর্মকার সম্প্রদায় আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই পেশাজীবীদের পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। তা না হলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পৈতৃক পেশা একসময় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জীবিকার তাগিদে পেশা বদলালেও অনেক চর্মকারের মন পড়ে আছে তাদের পুরোনো কাজে। অনুকূল পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তারা আবারও ফিরে যেতে চান নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পেশায়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় টিকে থাকার সংগ্রামই তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাছিন জামান/আরকে