মৌলভীবাজারে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ ব্যাহত

মৌলভীবাজারে পানি সংকটে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা যাচ্ছে না। একই সাথে যারা বোরো ধান চাষ করছেন, এমন অন্তত প্রায় ৬০ হাজার কৃষক তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন। অনেক কৃষক টাকা দিয়েও সেচ ব্যবস্থা পাচ্ছেন না। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সেচ সংকটে কৃষকেরা আবাদি জমি নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।
অনেক জমিতে চারা রোপণের পর সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। আবার কেউ সেচের অভাবে চারা রোপণ করতে পারছেন না। সেচনালা ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে যাওয়ায়, বিভিন্ন স্থানে ক্রসবাধ নির্মাণ, গভীর নলকূপ সংকট থাকায় সেচ নিয়ে হাওর পাড়ের কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পানি সংকটের বিষয়ে কৃষকেরা বলেন, সরকার যদি আমাদেরকে বোরো ধান চাষে পানির ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে আমন মৌসুমের মতো বোরো ধান চাষ করা সম্ভব। তবে বছরের পর বছর যায়, সেচের কোন ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় না। সেচ নালা খনন না করার কারণে পানি আসে না। হাওর ও নন হাওর এলাকাসহ সব জায়গায় পানির সমস্যা।
সরেজমিনে জেলার সাতটি উপজেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, কেওলার হাওরসহ নন হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাওরে যেমন- পানির সংকট, ঠিক একইভাবে নন হাওরে পানির অভাব রয়েছে তীব্র। অনেক জমিতে ধানের চারা রোপণের পরেও শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। আবার কেউ পানির অভাবে চারা রোপণ করতে পারেননি। একর প্রতি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করে বোরো ধান চাষ করে পানির জন্য সবকিছু নষ্ট হচ্ছে কৃষকের। জেলায় অন্ততপক্ষে প্রায় ৬০ হাজার কৃষক পানি সংকটে আছেন। এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বোরোধানের চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৪৫ হেক্টর হাওর এলাকায় ও নন হাওর এলাকা, ৩৫ হাজার ৫৫ হেক্টর। তবে এসব এলাকায় তীব্র সেচ সংকট রয়েছে। ৭টি উপজেলায় সরকারিভাবে ১৪টি সৌর সেচ চালু আছে। এর সংখ্যা বৃদ্ধি করলে সেচের সমস্যা কিছুটা সমাধান হতো। সেচের সংকট না হলে অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমি বোরো মৌসুমে চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার, শমশেরনগর, আলীনগর, আদমপুর ইউনিয়ন লাঘাটা নদীর পানি উজানে কম যাওয়ার কারণে সেচ সংকট রয়েছে। জেলার সদর উপজেলার গিয়াসনগর, মোস্তফাপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়নসহ কাঞ্জার হাওরের নিম্নাঞ্চলে পানি সংকট রয়েছে। কুদালী ছড়ার প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর বোরো ধান চাষাবাদে পানি সংকটে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কয়েক হাজার কৃষক। রাজনগর ও সদর উপজেলায় পানি সংকটের শংকায় প্রায় ১০ হাজার কৃষক। কাউয়াদীঘি হাওর সেচ-সুবিধা দিতে তৈরি করা ১০৫ কিলোমিটার সেচনালা নতুন করে খননের অভাবে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে প্রতিবছরই বোরো মৌসুমে সেচের পানি নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এছাড়া রাজনগর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে পানি সংকট রয়েছে। এছাড়া অনেক স্থানে ক্রসবাধ ও স্লুইসগেট দিয়ে পানি আটকিয়ে চাষাবাদ করায় উজানের কৃষকেরা পানি পাচ্ছেন না।
কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর, শরীফপুর, পৃথিমপাশাসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে পানি সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েক হাজার কৃষক। হাকালুকি হাওরের উপরের অংশেও তীব্র পানি সংকট রয়েছে। হাওরের গভীর থেকে ফিতা পাইপের মাধ্যমে পানি নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া জেলার জুড়ি ও বড়লেখায় পানি সংকটে বোরো ধান আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
কুলাউড়া উপজেলার কৃষক সালমান মিয়া, কমলগঞ্জের মর্তুজ আলী বলেন, পানি আসায় বোরো ধান চাষ করি। পরে আর পানি মেলে না। অনেক টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরতে হয়। ফসল বাঁচানোর জন্য অনেক দূর থেকে পানি আনতে হয়। মৌসুমের শুরুতে পানি কিছু পাওয়া গেলেও মাঝামাঝি সময়ে পানি একেবারে মেলে না।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, যেসব এলাকায় সেচ নালা আছে, সেখানে কম বেশি পানি পাচ্ছেন কৃষকেরা। সেচ নালার বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। সেচ নালায় সমস্যা হলে আমরা সমাধান করার চেষ্টা করি।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন নালা ও ছড়া দিয়ে পর্যাপ্ত পানি যাচ্ছে না। যার ফলে এই সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নলকূপের সমস্যার কারণে পানি পাচ্ছেন না কৃষকেরা। পর্যাপ্ত পরিমাণে নলকূপ বা সেচের ব্যবস্থা করলে এই জেলায় অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর বোরো ধান আবাদ বৃদ্ধি করা যাবে। শুধু কোদালি ছড়া সেচনালা করলে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা সম্ভব। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করেছি। যেসব ছড়া বা নালা দিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে না, এগুলো যেন খনন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় সৌর সোলার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সাথে নদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানের পাশ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে সেচ সংকট কিছুটা দূর করা সম্ভব।
মাহিদুল ইসলাম/এসএইচএ