ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫ স্থানে ভাঙা ডিভাইডার যেন ‘মৃত্যু ফাঁদ’

দেশের অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাদ্দাম মার্কেট এলাকা থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত প্রায় ২৫টি স্থানে সড়ক ডিভাইডার ভেঙে, কাত হয়ে বা সম্পূর্ণ পড়ে আছে। মাসের পর মাস এমন অবস্থায় পড়ে থাকায় কোথাও বড় ফাঁকা তৈরি হয়েছে, কোথাও ডিভাইডারের অংশ ঝুঁকে আছে সড়কের ওপর। এসব ফাঁক দিয়ে অবাধে পারাপার করছেন পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা, ফলে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে প্রতিনিয়ত।
মহাসড়কটিতে সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ যানবাহন তার চেয়ে বেশি গতিতে চলে। এমন পরিস্থিতিতে ডিভাইডারের খোলা অংশগুলো হয়ে উঠেছে ‘মৃত্যু ফাঁদ’।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাতুয়াইল, সাদ্দাম মার্কেট, সাইনবোর্ড, সানারপাড়, মৌচাক, চিটাগাংরোড, কাঁচপুর, মদনপুর ও মোগরাপাড়া এলাকায় অন্তত ২৫টি স্পটে ডিভাইডারের অবস্থা নাজুক।
মৌচাক এলাকায় দুটি ডিভাইডার প্রায় আট মাস ধরে কাত হয়ে পড়ে আছে। একটির কংক্রিট অংশ ভেঙে রড বের হয়ে আছে। স্থানীয়রা জানান, রাতের বেলায় আলোর স্বল্পতায় এগুলো চোখে পড়ে না। এতে হঠাৎ ব্রেক কষতে গিয়ে পেছনের গাড়ির ধাক্কায় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি সাইনবোর্ড এলাকায় প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেলের সামনে। প্রায় আড়াই ফুট ডিভাইডার ভাঙা থাকায় এখান দিয়ে হুটহাট মোটরসাইকেল পারাপার হচ্ছে। ডগাইর ও কোনাপাড়া এলাকা থেকে আসা রোগীরা রিকশায় করে এসে ওই ফাঁক দিয়ে রাস্তা পার হন। অথচ প্রায় ২৫০ মিটার সামনে একটি ফুটওভারব্রিজ রয়েছে, যেখানে সিঁড়ি ও ফ্ল্যাট র্যাম্প দুটোরই ব্যবস্থা আছে।
সাইনবোর্ড এলাকায় মোটরসাইকেল চালক রেজাউল করিম বলেন, ঘুরে ইউটার্ন নিতে গেলে অনেক দূর যেতে হয়। তাই ফাঁকা জায়গা দেখলেই পার হয়ে যাই। ঝুঁকি আছে জানি, কিন্তু সময় বাঁচাতে বাধ্য হই।

ডগাইর থেকে আসা এক পথচারী রহিমা বেগম বলেন, ফুটওভার ব্রিজ আছে ঠিকই, কিন্তু সেখান দিয়ে উঠতে কষ্ট হয়। অসুস্থ মানুষ নিয়ে সিঁড়ি ভাঙা কষ্টকর। তাই নিচ দিয়েই পার হই।
তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, ডিভাইডার ভাঙার পেছনে আমাদের অসচেতনতাও দায়ী। রাতের আঁধারে কিছু মোটরসাইকেল আরোহী ইচ্ছাকৃতভাবে কংক্রিট ভেঙে পথ তৈরি করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ট্রাফিক ইনচার্জ জুলহাস উদ্দিন বলেন, ডিভাইডার ভাঙা থাকলে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে দ্রুতগতির বাস বা ট্রাক হঠাৎ সামনে মোটরসাইকেল দেখলে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক বছরে এসব খোলা অংশের কাছাকাছি ছোট-বড় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। যদিও সব ঘটনা থানায় নথিভুক্ত হয়নি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ উপবিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে। তাই সড়কের ডিভাইডারসহ অবকাঠামোগুলো নিরাপদ রাখা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও ডিভাইডার ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে গেলে তা দ্রুত সংস্কারের জন্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু স্থানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে এবং যেসব স্থানে এখনো কাজ শুরু হয়নি সেগুলোও দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দুর্ঘটনার ধাক্কায় ও বিগত দিনের আন্দোলনের কারণে ডিভাইডার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবেও ডিভাইডার ভেঙে পারাপারের পথ তৈরি করেন। এতে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। আমরা নিয়মিত পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তবে জনগণের সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের অনেক সময় দেখা যায় ডিভাইডারের ফাঁকা অংশ দিয়ে হঠাৎ করেই রাস্তা পার হতে। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনবিরোধী। কোনো স্থানে ডিভাইডার ভাঙা বা ফাঁকা থাকলেই যে সেটি পারাপারের পথ এমন ধারণা ঠিক নয়। সড়কে নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্ধারিত ইউটার্ন, আন্ডারপাস বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা উচিত। সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, তবেই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
আরকে