ছুরিকাঘাতে স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর যুবকের আত্মহত্যা, যা জানা গেল

নওগাঁর আত্রাইয়ে নিজ স্ত্রী ও সন্তানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন স্বামী জয় সরকার (২৭)। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার ভোঁপাড়া ইউনিয়নের বলরামচক গ্রামের চৌধুরী পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেলে মরদেহগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গৌতম সকারের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে জয় সরকার গত প্রায় ৮ বছর আগে মাদকের সাথে জড়িয়ে যান। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলার মেয়ে বৃষ্টি রানীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জয়। সন্তান মাদক থেকে দূরে থাকবে এবং ভালো হয়ে যাবে এ জন্য পারিবারিকভাবে ৫ বছর আগে বৃষ্টি রানীর সাথে বিয়ে দেওয়া হয় জয়ের। কিন্তু বিয়ের পরও তার অভ্যাস পরিবর্তন না হওয়ায় সংসারে ঝগড়া ও কলহ লেগেই থাকতো। জয় মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া হওয়ার কারণে স্ত্রী বৃষ্টি অনেকবার সংসার ছেড়ে চলে যান এবং ফিরেও আসেন। মাদক কেনার জন্য প্রায়ই বাবার কাছে টাকা দাবি করতেন জয়। টাকা দিতে না পারলে বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করতেন। এসব নিয়ে সংসারে অশান্তি দেখা দিতো।
বৃহস্পতিবার রাতেও এসব বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে জয়ের ঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা ছুটে যান। স্ত্রী ও সন্তানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত ও জয়ের গলায় ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে স্ত্রী বৃষ্টি রানী মারা যান। গুরুতর অবস্থায় জয় সরকার ও মেয়ে জিনি সরকারকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তারাও মারা যান।
ঘটনাটি জানতে ও এক নজর দেখতে স্থানীয় সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সকাল থেকে ওই বাড়িতে ভিড় করছেন। তবে নিহতের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে থাকায় ওই বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনরা ছিলেন।
প্রতিবেশী বিজন কুমার ও ভুবন বলেন, জয় মাকদাসক্ত ছিলো। নেশার জন্য টাকা চাওয়া নিয়ে প্রায় ঝগড়া হতো। টাকা না দিলে বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো। একাধিক মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন আছে। তারপরও আরও চাহিদা ছিল। মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। রাত সাড়ে ১২টার দিকে জয়ের বাড়িতে হঠাৎ চিৎকার শুনতে পাই। বাড়ির বাইরে এসে দেখি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করা হচ্ছে। জয়ের গলায় রক্তাক্ত কাপড় পেঁচানো ছিল, তার স্ত্রী ও সন্তান্তের বুকে-পেটে ছুরিকাঘাত এবং প্রচুর রক্ত ঝরছিল।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) শেফালি খাতুন বলেন, রাতেই ঘটনাটি শুনেছি কিন্তু আসতে পারিনি। সকাল ৮ টার দিকে নিহতের বাড়িতে আসি। পরিবারটি ভালো ছিলো। কিন্তু মাদকাসক্ত ছেলের কারণে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। মাদকের কারণে তিনটি জীবন শেষ হয়ে গেল।
নিহত জয় সরকারের মা চায়না সরকার বলেন, জয়ের মানসিক রোগ ছিল। মাথা কাজ করত না, অল্পতেই রেগে যেত। তাকে কোনোভাবেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যেত না। আজকে নওগাঁ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইছিলাম। আমার একটাই সন্তান চিকিৎসা তো করানো লাগবে। ঘরের মধ্যে পাঁচটা মিনিটও সময় দিল না। এর মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।
তিনি বলেন, আমরা কেউ তখন ঘুমাই নাই, জাগ্রত অবস্থাতেই এই ঘটনা ঘটায় ফেলল। আমাদের যৌথ পরিবার, আমরা সবাই একসঙ্গেই থাকি। আমার শ্বশুর অসুস্থ। রাত ১২টার দিকে আমার ছেলে এবং তার বউ যেয়ে আমার শ্বশুরকে দুই চামুচ ফলের রস খাইয়ে আসলো। আমরা ঘরের দরজাও তখন বন্ধ করিনি। এর মধ্যেই আমার ছেলের রুম থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজ শুনে তার রুমের সামনে আসি। চিৎকার করে আমার ছেলে মাঝেমধ্যেই ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো। এবারও সেটাই মনে করছিলাম। তার ঘরের গেট খুলতেই দেখি আমার বউমা মাটিতে পড়ে গেল। আমার ছেলে হাতে ধারালো চাকু দিয়ে নিজের গলার কাছে কোপাচ্ছে। আমরা চিৎকার করে লোকজনদেরকে ডাকতে থাকি। কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না। সবাই দেখে দেখে চলে যাচ্ছে। এই ঘটনা ঘটবে কখনো কল্পনাই করতে পারিনি। আমার ছেলে মাঝেমধ্যে যখন জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো, তখন তার হাতে পায়ে ধরে নিষেধ করতাম যে বাবা ভাঙচুর করিস না। বেকার ঘুরে বেড়াতো, সেভাবে কোনো কাজকর্ম করতো না। এটা নিয়ে মাঝেমধ্যে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টুকটাক গন্ডগোল হতো। আমি যখন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পাই, তখন সে আমাকে বলে ‘মা তুমি আমাকে ধরো না, আমার কষ্ট হচ্ছে।’ এতোটুকুই বলেছিল।
নিহত বৃষ্টির মামাতো বোন তাপসী রায় বলেন, বিয়ের পর থেকে বৃষ্টি বলতো তার বর তার ওপর নাকি প্রায় প্রায় নির্যাতন করে। আমাদের এখানে যখন আসত বৃষ্টি তখন এখান থেকে আর যেতে চাইত না। শেষবার এসে বলতেছিল আমি আর যাব না। দুইদিন পর বৃষ্টির বর আমাদের এখানে এসেছিল। জোর করে বৃষ্টিকে নিয়ে গেছে। ওর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গেও প্রায়ই ঝগড়া হতো। তারা বৃষ্টিকে অনেক অনুরোধ করে এবার আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। তারা যে এভাবে বৃষ্টিকে মারবে আমরা ধারণাই করতে পারি নাই। তারা মারার জন্যই বৃষ্টিকে নিয়ে আসছে। আমাদের বাচ্চাটা কীভাবে মেরে ফেলল, আমরা ধারণাই করতে পারি নাই। আমরা গরিব মানুষ। তাকে কেন এভাবে মারা হলো, আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
আত্রাই থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল করিম বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে স্ত্রী বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর গুরুতর অবস্থায় স্বামী ও সন্তানকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোরে তারা দুজন মারা যায়। নিহত জয় সরকার মাদকাসক্ত ছিলেন। তিনি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সাথে বেপরোয়া আচরণ করতেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। মেয়ের পরিবারের সদস্যরা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মনিরুল ইসলাম শামীম/আরএআর