খাগড়াছড়ির পাহাড়ে আগুন : প্রতিবছর ধ্বংস হচ্ছে লাখো বন্যপ্রাণী-উদ্ভিদ

খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে লাগানো আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অগণিত প্রাণী ও উদ্ভিদ। জুম চাষের প্রস্তুতি, বাগান পরিষ্কার, অব্যবস্থাপনা কিংবা অসতর্কতার ফলে ছড়িয়ে পড়া আগুন মুহূর্তেই গ্রাস করছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য। আগুনে সরীসৃপ, উভচর, পাখি, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে অগণিত কীটপতঙ্গ পুড়ে মারা যাচ্ছে; ধ্বংস হচ্ছে বনমোরগের বাসা, পাখির ডিম, নবীন চারা ও ঔষধি গাছ।
খাগড়াছড়িতে এখন চলছে শুষ্ক মৌসুম। প্রতিবছর এ মৌসুম এলেই পাহাড়ে আগুনের আতঙ্ক শুরু হয়। অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া হয়। কিন্তু এর ক্ষতির ব্যাপকতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই।
পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচলিত জুম চাষের অংশ হিসেবে পাহাড়ে আগুন দেওয়া হয়। ঐতিহ্যগতভাবে সীমিত পরিসরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে আগুন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের বনাঞ্চল, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদবিন্যাসে। এতে মাটির উপরে ও নিচে বসবাসকারী প্রাণীরা পালানোর সুযোগ পায় না।
মাটিতে বসবাসকারী সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি এবং অসংখ্য পোকামাকড় আগুনে পুড়ে মারা যায়। বিশেষ করে ডিম পাড়া মৌসুমে আগুন লাগলে পাখির বাসা ও ডিম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বনমোরগ, ঘুঘু, শালিক, বুনো বহু পাখির প্রজননচক্র ব্যাহত হয়।
শুধু জুম নয়, বিভিন্ন ধরনের বাগান পরিষ্কারের নামেও আগুন দেওয়া হয়। শুকনো পাতা ও আগাছা দ্রুত সরাতে আগুনকে সহজ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় বাতাসের গতি বেশি থাকায় ছোট আগুনও দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। এতে পাশের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের আগুনে শুধু প্রাণী নয়, পাহাড়ের উর্বর মাটির ওপরের স্তরও পুড়ে যায়। মাটির জৈব উপাদান, কেঁচো ও অণুজীব ধ্বংস হয়ে মাটির উর্বরতা কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পাহাড়ি বনে রয়েছে বহু প্রজাতির দেশীয় গাছ, ঔষধি উদ্ভিদ ও বিরল প্রজাতির লতা-গুল্ম। আগুনে এসব উদ্ভিদ পুড়ে গেলে শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বঞ্চিত হবে। পাহাড়ি অর্কিড, বিভিন্ন ভেষজ গাছের চারা আগুনে নষ্ট হয়।
গাছপালা পুড়ে যাওয়ায় বনাঞ্চলের ছায়া কমে, ফলে মাটির আর্দ্রতা হ্রাস পায়। প্রাকৃতিক ছড়া ঝর্ণার পানি শুকিয়ে যায়। এতে নতুন চারা জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট হয়। আগুনের পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত হলে মাটির ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নেমে যায়, বাড়ে ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি। এতে পাহাড় ধসে পড়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
প্রাণী ও উদ্ভিদের এই ব্যাপক ক্ষতি পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করে। পোকামাকড় কমে গেলে সেগুলো খেয়ে বেঁচে থাকা পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দেয়। একইভাবে ছোট প্রাণী কমে গেলে বড় শিকারি প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্র অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ঢালে বৃষ্টির সময় দ্রুত পানি নেমে আসে, কারণ গাছের শিকড় ও ঝোপঝাড় মাটি ধরে রাখতে পারে না। এতে নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।
যাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমাদের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে আগুন দেওয়ার ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য, প্রাণ-প্রকৃতি বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়ছে। এখন আগের মতো জীববৈচিত্র্য দেখা যায় না। ক্ষতিকর কার্যক্রমগুলোর কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এবং আমাদের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা গেলে, বিশেষ করে বনাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করলে, হয়তো তারা এসব ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। পাহাড়ে আগুন লাগানো বন্ধ হলেই পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাছান আহম্মদ বলেন, খাগড়াছড়িতে প্রতিবছর পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে আগুন দেওয়ার ফলে পাহাড়ের মূল্যবান গাছপালা, জীববৈচিত্র্য, প্রাণীকুল এবং মাটিসহ সবকিছু ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। এর ফলে বাস্তুসংস্থানেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত আগুনের কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণীকুল।
খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা বলেন, খাগড়াছড়ি বন বিভাগ বন্যপ্রাণী ও এখানকার জীববৈচিত্র্যের জন্য খুবই সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এখানে প্রচুর বন্যপ্রাণী রয়েছে এবং অনেক প্রজাতির গাছপালা আছে। বিভিন্ন কারণে পাহাড়ে আগুন লাগানো হয়। আগুনে জীববৈচিত্র্যের ক্ষুদ্র অনুজীব থেকে শুরু করে সকল বন্যপ্রাণী এবং গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। পাহাড়ে আগুন দেওয়া রোধে জেলা প্রশাসন ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় প্রায়ই আলোচনা হয়। গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে অনেকবার সভা করা হয়েছে। জুম চাষের ক্ষেত্রে আগুন না লাগিয়েও শুধুমাত্র আগাছা পরিষ্কার করে চাষাবাদ করা যায়। সে ক্ষেত্রে ক্ষতি কিছুটা কমে আসবে। একসঙ্গে বিশাল এলাকার জঙ্গল না কেটে ছোট ছোট ভাগে জুম চাষ করলেও বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য কিছুটা রক্ষা পাবে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, বন ও পরিবেশ রক্ষায় জেলা পরিষদ কাজ করছে। ইতোমধ্যে বন বিভাগকে বন রক্ষায় সেগুন গাছ লাগানো পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রায়ই শোনা যায়, বানর গ্রামে চলে আসছে। এতে বোঝা যায় পাহাড়ে তাদের খাবার কমে গেছে। পাহাড়ের রিজার্ভ ফরেস্টগুলো রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকারের সময় নতুন করে এক লাখ গাছ লাগানো হবে। পাহাড়ে বন না থাকলে পানি থাকবে না। পানি ও প্রাণীকুল রক্ষায় আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। সরকার এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে প্রাণীবৈচিত্র্যের বিলুপ্তি রোধে কাজ করা হবে।
প্রতিবছর পাহাড়ে আগুনে পুড়ে যে অগণিত প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল সংখ্যার হিসাব নয় এটি একটি বাস্তুতন্ত্রের ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্প। খাগড়াছড়ির পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য যদি টিকে রাখতে হয়, তবে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মোহাম্মদ শাহজাহান/এসএইচএ