নারীর ঘামে সচল চরাঞ্চলের কৃষিকাজ, স্বীকৃতিতে আকাশ-জমিন ফারাক

গাইবান্ধার তিস্তাপাড় ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের নীরব বিপ্লব ঘটছে। সেই বিপ্লবের বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন নারীরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে জমিতে কাজ, সবজি বাগান, গবাদিপশু পালন, ফসল তোলা, কাটা-মাড়াই থেকে শুরু করে ফসল শুকানো-ফলানো, সব ক্ষেত্রেই এখন পুরুষদের পাশাপাশি সমান তালে কাজ করছেন তারা। তবুও কৃষিতে তাদের অবদান এখনও সেভাবে মূল্যায়ন পায় না।
তাদের পারিশ্রমিক, স্বীকৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে রয়েছে আকাশ-জমিন ফারাক। এই দৃশ্যমান ফারাকটা আরও সহজে ধরা পড়ে সরাসরি শ্রমজীবি নারীদের বেলায়। যারা মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ, পায়ে তপ্ত মাটি কিংবা হাড় কাঁপানো শীত-কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে জীবিকার তাগিদে বিচরণ করে শক্ত মাঠে।
আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায় বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’’। প্রতি বছর সরকারি প্রতিপাদ্যে চমকপ্রদ বাক্যের বিন্যাস থাকলেও তার বাস্তবায়ন ঘটে কতটুকু বা বাস্তাবায়ন ঘটাতে উদ্যোগই বা নেওয়া হয় কি পরিমাণ? বাস্তবে নারী-পুরুষের অধিকার সমতার প্রশ্নে শ্রমজীবি নারীদের জীবনে তার বিন্দুমাত্রও প্রভাব পড়ে না।

গাইবান্ধা জেলার সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি, ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের নদীবেষ্টিত ১৬৫টি চর গ্রামে বাস করে প্রায় ৪ লাখ মানুষ। জেলার মোট ভৌগোলিক এলাকার ৩৫ শতাংশই চরাঞ্চল। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে বর্ষা শেষে চরজুড়ে ভূট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ, বাদাম, ডালসহ বিভিন্ন তরকারির চাষাবাদ। এসব চাষাবাদের ধাপে ধাপে জমি প্রস্তুত, ক্ষেতের পরিচর্যা, কাটা-মাড়াই-ঝাড়াই ও পরবর্তীতে শস্য ঘরে তোলা-এর প্রত্যেকটি কাজে সমান আবার কোনো ক্ষেত্রে নারীদের বিচরণ থাকে অনেক বেশি।
রোববার (৮ মার্চ) সকল ৮টায় সরেজমিনে জেলার ফুলছড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বালাসীঘাটে গিয়ে দেখা যায়, এপার থেকে নৌকায় করে ওপারে (চরে) ছুটছে নৌকা ভর্তি নারী শ্রমিক। ভোরের আলো ফুটতেই কাজের সন্ধানে প্রতিদিন ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন শত শত নারী শ্রমিক।
এদিন উপজেলার ফুলছড়ি উপজেলার রসূলপুর, হারোডাঙা, গুপ্তমনি ও রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি চর ঘুরে দেখা যায়, পাকা মরিচ তোলা ও শুকনা মরিচ বাছাই নিয়ে কর্মচাঞ্চল্যতা চলছে। নারীরা কোথাও দলবদ্ধভাবে কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে ক্ষেতের মরিচ তুলছেন, বস্তা করছেন। কোনো নারী তপ্ত রোদে মিল চাতালে রোদে শুকাতে দিচ্ছেন মরিচ। এছাড়া দলবদ্ধভাবে চলছে শুকনা মরিচ বাছাইয়ের কাজ। কেউ কেউ কাজ করছেন ভূট্টার জমিতে আগাছা বাছাইয়ের। যারা এসব কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগ নারীই এপার থেকে যাওয়া।

চরাঞ্চলের মাঠে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই চোখে পড়ে গরিব ঘরের এক নারী সফিয়া বেগম। মাথায় রোদ, হাতে দড়ি, সামনে কয়েকটি গাভী আর ছাগল নিয়ে ধীরে ধীরে মাঠের দিকে যাচ্ছেন তিনি। স্বামী আশরাফ আলী জীবিকার তাগিদে ঢাকায় কাজ করেন। সফিয়া জানান, ঈদের সময় স্বামী বাড়ি ফিরলে এই ছাগলগুলো বিক্রি করে ভাঙাচোরা ঘর মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়েই তাই প্রতিদিনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
একটু দূরে দেখা যায় আরও দুই নারী মাথায় করে গাভীর জন্য গোখাদ্য নিয়ে বাড়ির পথে ফিরছেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মাঠে গিয়ে ঘাস কেটে এনেছেন। কারণ, দিনের রোদ উঠলেই উঠোনে মরিচ শুকাতে হবে। তাই সকাল সকাল গাভীর খাবার জোগাড়ের কাজ শেষ করে নিয়েছেন তারা।
চরের কৃষিজীবনে এমন দৃশ্য যেন খুবই পরিচিত। কৃষি উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল তোলা থেকে শুরু করে গবাদিপশুর দেখভাল সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান স্পষ্ট। স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক পরিবারেই পুরুষ সদস্যরা মৌসুমি কাজের সন্ধানে শহরে চলে গেছেন। ফলে সংসার সামলানোর পাশাপাশি পুরো কৃষিকাজের দায়িত্ব এখন কাঁধে তুলে নিয়েছেন গ্রামের নারীরাই।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নারীদের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। অনেক নারী এখন বাড়ির উঠানেই সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা ছোট আকারে বীজ উৎপাদন করে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবারেও বাড়ছে নারীদের ভূমিকা।
তবে পরিবার ও কৃষিক্ষেত্রে সমানতালে কাজ করলেও মূল্যায়নের খাতায় নারীরা এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। মাঠে-ঘাটে তাদের শ্রম চোখে পড়লেও সেই পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিশেষ করে দৈনিক মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও স্পষ্ট। একই জমিতে, একই কাজ করেও যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা পূর্ণ মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের পারিশ্রমিক প্রায় অর্ধেকেই সীমাবদ্ধ থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিশ্রম বা সময়ের দিক থেকে নারীরা কোনো অংশে কম নন। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধৈর্য ও যত্নের কাজগুলো নারীরাই বেশি দক্ষতার সঙ্গে করে থাকেন। তবুও মজুরি নির্ধারণের সময় পুরুষ ও নারীর মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রেখে দেওয়া হয়।
কিছু নারী শ্রমিকের অভিযোগ, কাজের ধরন বা অতিরিক্ত সময়ের ভিত্তিতে পুরুষদের অনেক সময় বাড়তি পারিশ্রমিক দেওয়া হলেও নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ খুব একটা মেলে না। ফলে সমান শ্রম দিয়েও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামের অসংখ্য নারী শ্রমিক।
ফুলছড়ি উপজেলার রসুলপুর চরের নাম বলতে নারাজ এক নারী জানান, ভোরে উঠেই গরু-ছাগল সামলাই, তারপর জমিতে যাই। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি তোলা, মরিচ লাগানো, তোলা শুকানো সবই করি। কিন্তু বাজারে ফসল বিক্রি করতে যায় পুরুষরা। টাকাও খরচ হয় তাদের মতো করে। কখনো প্রয়োজনও মনে করেনা পরামর্শ করার। কিংবা আমাদের চাহিদা মতো, নিজের মতো করে টাকার ব্যবহারও করতে পারি না আমরা। তখন মনে হয় আমাদের কষ্টের মূল্যটা কেউ দেখে না।

এসময় হারো ডাঙার চরের নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম, আমরা সকাল সাড়ে ৮ টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে মরিচ তোলার কাজ শুরু করি। দিনভর কাজ করে আমাদের কামলার দাম (মজুরি) দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ টাকা। একই কাজ করলে পুরুষদের দেওয়া হতো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
অপর নারী শ্রমিক জামিলা বেগম বলেন, আমরা মরিচ তুলছি চুক্তিভিত্তিক। বস্তা প্রতি দুইকেজি মরিচ পাই আমরা। এছাড়া আমরা পুরুষদের সঙ্গে ভুট্টা ভাঙার কাজ করি। আমরা ৩০০ টাকার বিনিনিময়ে সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করি। অথচ আমাদের সঙ্গে যে তিনজন পুরুষ কাজ করছে তাদের মজুরি ৬০০ টাকা। একই সঙ্গে, একই সময় কাজ করে আমরা অর্ধেক দাম পাই। এসময় এক প্রশ্নের জবাবে জোবেদা বলেন, কি করমো (করবো) তাছাড়া খাব কি? আমরা গরিব মানুষ।
ফজলুপুর ইউনিয়নের স্থানীয় কীটনাশক ব্যবসায়ী ও গৃহস্থ কৃষক মালেক আফসারী বলেন, “গ্রামের নারীরা অত্যন্ত মনোযোগ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করেন। কৃষিকাজের অনেক সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ কাজ তারা ধৈর্য ধরে সম্পন্ন করেন। কিন্তু সামাজিক নানা রীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক সময় তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। অনেকেই এখনও নারীদেরকে কম শক্তির অধিকারী হিসেবে দেখেন।”
তিনি আরও বলেন, বাস্তবে চরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যে পরিমাণ কাজ প্রয়োজন, তার প্রায় ৯০ শতাংশই নারীদের হাত ধরে সম্পন্ন হয়। গবাদিপশুর দেখভাল থেকে শুরু করে মাঠের কাজ সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি সম্পর্কে সচেতন ও অভিজ্ঞরা বলছেন, চরাঞ্চলে কৃষি উন্নয়নের জন্য নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীরা যদি কৃষি পণ্যের বিপণন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি সুযোগ পান, তাহলে চরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন আরও বহুগুণ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে শুধু চরাঞ্চলে নয়, গাঁয়ের কাঁদা মাখা মাঠ থেকে শহর সবখানেই এখন নারীদের সরব উপস্থিতি দৃশ্যমান। আধুনিককালে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কমেনি বঞ্চনা। হাড়ভাঙা খাটুনির শেষে তাদের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
এ বিষয়ে নারীমুক্তি কেন্দ্রের গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন শিল্পী বলেন, সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা এখনও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে শ্রমের মূল্য নির্ধারণে এই বৈষম্য আরও প্রকটভাবে দেখা যায়।
তিনি বলেন, নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল নীতিমালা প্রণয়ন বা কাগজে-কলমে কাজ দেখালেই চলবে না, কিংবা প্রতিপাদ্যে আটকে থাকলে চলবেনা বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সেই নীতিমালার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। তবেই নারী শ্রমিকদের প্রতি দীর্ঘদিনের এই আকাশ-জমিন বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, কৃষিক্ষেত্রে নারীদের ৩০ শতাংশ অংশ গ্রহণ আমরা শতভাগ করার চেষ্টা করি। চরাঞ্চলের নারীদের কৃষিকাজে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন মাঠ দিবসে আমরা অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে থাকি। যেহেতু চরের কৃষি চাষাবাদে নারীদের ভূমিকা অনেক বেশি তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনে আমাদের চেষ্টা অব্যহত থাকবে।
নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যোগাযোগ সংকটের মধ্যেও চরাঞ্চলের নারীরা লড়াই করে টিকিয়ে রাখছেন কৃষি উৎপাদন। তাদের ঘামেই সবুজ হচ্ছে চরের জমি, বদলে যাচ্ছে অনেক পরিবারের ভাগ্য। অথচ সেই অবদানের স্বীকৃতি এখনও সীমিত।
চরের কৃষি অর্থনীতির এই নীরব নায়িকাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে গাইবান্ধার চরাঞ্চলেই গড়ে উঠতে পারে টেকসই কৃষি উন্নয়নের নতুন
আরকে