উদযাপনের ভেতর-বাহির : দেশের নারীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতখানি?

আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় নারীদের অর্জনকে সম্মান জানাতে এবং লিঙ্গসমতার জন্য চলমান সংগ্রামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। এই দিনটি নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবদানকে স্বীকৃতি দেয়, পাশাপাশি একটি আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে ঘিরে নানা আয়োজন চলছে। কোথাও গোলাপি-সবুজ-বেগুনি রঙের ব্যানার ছাপা হচ্ছে, কোথাও কনভেনশন হল ভাড়া করে আলোচনা সভা, খাবারদাবার কিংবা প্যানেল আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। অনেক অনুষ্ঠানে আজ আলোচনার বিষয়, বাংলাদেশে নারীর অবস্থান, কন্যা শিশুর ঝরে পড়া, বাল্যবিয়ে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কিংবা নেতৃত্বে নারীর প্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি।
এসব নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এই আলোচনাগুলো আমাদের সমাজকে ভাবতে শেখায়, সমস্যা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে এবং পরিবর্তনের একটি ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই আলোচনার পর বাস্তবে কতটা পরিবর্তন ঘটে? প্রতিবছর একই আলোচনার পুনরাবৃত্তি কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত সমতার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি কখনো কখনো তা আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতেই আটকে থাকে? নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আলোচনার পর তা নীতি, আচরণ ও সামাজিক কাঠামোর বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়। কিন্তু এবার আমার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি থেকেই যাচ্ছে। বারবার মনে পড়ছে আট বছরের জান্নাতুল নিশা ইরার কথা—যাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে সীতাকুণ্ডের ইকো পার্কে ফেলে রাখা হয়েছিল। ইরা বাঁচতে চেয়েছিল। আমরা যখন অগ্রগতি ও সম্ভাবনার গল্পে দাঁড়িয়ে নারী দিবস উদযাপন করি, তখন সেই উদযাপনের ঠিক বাইরেই বহু নারী—আমাদেরই দেশের নারী—এক ভিন্ন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে দিন পার করছেন। কিছু অস্বস্তিকর সত্য আছে, যেগুলো আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো গভীর ও নীরব সামাজিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর Violence Against Women Survey 2024 অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের ৭৫.৯ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত ১২ মাসেই ৪৮.৭ শতাংশ নারী এমন সহিংসতার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন (BBS, 2025)।
বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক এই কারণে যে, সহিংসতার শিকার নারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকেই জানান না, যা সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণের প্রতিফলন (BBS, 2025)।
একই জরিপে দেখা যায়, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীরা সহিংসতার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি এবং শহরের বস্তি ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী নারীদের ক্ষেত্রে সহিংসতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। পাশাপাশি প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে—প্রায় ৮.৩ শতাংশ নারী অনলাইন হয়রানি, যৌন ব্ল্যাকমেইলে সহিংসতার শিকার হয়েছেন (BBS, 2025)।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং সমাজের গভীরে থাকা বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার একটি কঠিন স্মরণও। এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো আমাদের সমাজের মেয়েদের ভয়, স্বপ্ন থমকে যাওয়ার গল্প, প্রতিদিনের লড়াইয়ের বাস্তবতা।
আরও পড়ুন
বিশ্বের নারীরা যখন বিভিন্ন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশও সেই একই বাস্তবতার অংশ। গাজা, আফগানিস্তান, ইরান কিংবা নাইজেরিয়ার নারীদের দুর্দশার কথা আমরা সংবাদে দেখি। কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরেও একই ধরনের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা ঘটছে—কখনো পাহাড়ে, কখনো উপকূলে, কখনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, আবার কখনো শহরের বাসাবাড়ির নীরব ঘরে।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় কিশোরী মেয়েরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। আর পোশাক কারখানায় হাজার হাজার নারী প্রতিদিন অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন—নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানের দাবিতে। এই বাস্তবতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর সংগ্রাম কোনো একক ভূগোলের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে স্থানীয়। বাংলাদেশও সেই জটিল বাস্তবতার বাইরে নয়।
প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—আমরা কি কেবল অনুষ্ঠান করেই থেমে থাকব? আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন; এগুলো সচেতনতা তৈরি করে এবং পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দেয়। কিন্তু এখন সময় এসেছে আমাদের শক্তি, সময়, অর্থ ও মনোযোগের একটি বড় অংশ সেই নারী ও কন্যা শিশুদের পাশে দাঁড়াতে ব্যবহার করার—যাদের এখনই সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন। এই সমাজে অনেক নারী সমান সুযোগের জন্য নয়, বরং কেবল নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্যই লড়াই করছেন—নিরাপদ স্কুল, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সহিংসতামুক্ত জীবনের জন্য।
তাই নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল উদযাপনে নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপে। নীতিনির্ধারক, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে কন্যা শিশুর শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার দ্রুত ও নিশ্চিত করা যায়। কারণ নারী দিবস কেবল একটি দিনের প্রতীক নয়; এটি একটি প্রতিশ্রুতি—এমন এক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি, যেখানে প্রতিটি মেয়ে নিরাপদে বড় হতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।
সাগর মারান্ডি : ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ
[email protected]