নালা না থাকায় গাইবান্ধায় বীজতলা থেকে পাকা ধান সবই ডুবে পানিতে

গাইবান্ধায় মাত্র দুই কিলোমিটার অংশে নালা না থাকার কারণে প্রত্যেক বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কয়েক হাজার কৃষক। শুধু বর্ষা মৌসুমে নয়, খরা মৌসুমেও সামান্য বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা। জলাবদ্ধতার কারণে কখনও কখনও সঠিক সময়ে বীজ বপন করা সম্ভব হয় না, হলেও আবার নষ্ট হয় বীজতলা। ফলে একদিকে যেমন সঠিক সময়ে চারা রোপণ ব্যাহত হয়, অন্যদিকে পানির মধ্যে অপরিপক্ব কাঁচা ধানেই কাটতে হয় চাষীদের।
বীজতলা থেকে শুরু করে পাকা ধান-প্রায় সব ফসলই পানিতে তলিয়ে যায়। এমন উভয় সংকটময় অবস্থা গাইবান্ধার সদর উপজেলা বোয়ালী ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষকের। স্থানীয়দের দাবি, দুই কিলোমিটার নালা খনন হলেই এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে ক্ষতির বোঝা টানতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের ভাষ্য, এই এলাকায় ইরি-বোরো ও আমন ধানের পাশাপাশি গম, সরিষা এবং আউশ ধান চাষেরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় এই জমিগুলোতে তিন ফসলি আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। তারই অংশ হিসেবে গেল ২২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের ‘খনন ও পুনঃখনন উপযোগী খালের তথ্য’ চেয়ে পত্র সরবরাহ করেছে সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।
এই অঞ্চলের কৃষকদের দাবি, খনন তালিকায় এই নালা অন্তর্ভুক্ত করে জরুরি ভিত্তিতে কাজ বাস্তবায়ন করে কৃষকদের প্রতিবছর অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা হোক।
সরেজমিনে শুক্রবার (৬ মার্চ) দুপুরে ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চলছে ইরি-বোরো ধানের চাষাবাদ। কৃষকরা ব্যস্ত জমির পরিচর্যায়। তবে মাঝখানের যে দুই কিলোমিটার এলাকায় নালা নেই, সেখানে পানি জমে থাকার চিহ্ন স্পষ্ট। আশপাশের নালাগুলোতে এখনও পানি রয়েছে, কোথাও কোথাও স্থানীয়রা মাছও ধরছেন।
জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সাদুল্লাপুর থেকে আসা একটি নালা তুলসীঘাট হয়ে বোয়ালী ইউনিয়নের শেষ অংশে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের মৃত কাদের মিয়ার বাড়ির সামনে এসে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর-হরিপুর মৌজা থেকে শুরু হওয়া আরেকটি নালা গিয়ে মিশেছে আলাই নদীতে। কিন্তু কাদের মিয়ার বাড়ি থেকে ভেলাকোপা হয়ে পূর্ব হরিপুর পর্যন্ত মাঝখানের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় কোনো নালা নেই। ফলে এই অংশে জমে থাকা পানি বের হতে না পেরে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের মতে, প্রায় তিন দশক আগে বড় বন্যার পর নালাটির তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। পরে সংস্কারের অভাবে নালা ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। এরপর জমির মালিকরা অনেক জায়গায় নালার অংশ ভরাট করে ফেলেন। যার ফলে এখন পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষক মফেজ্জল হোসেন বলেন, বর্ষায় শুধু আমন নয়, ইরি মৌসুমেও আমাদের পাকা ধান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাটতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এতে অনেক সময় ধান নষ্ট হয়ে যায়, আবার শ্রমিকের মজুরিও দ্বিগুণ দিতে হয়।
উত্তর হরিনসিংহা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, প্রতি বছরই দুই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের শত শত বিঘা জমির ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়। চাষাবাদ করতে হাল, সার-বীজ, কীটনাশক, সেচ—সব মিলিয়ে প্রচুর খরচ হয়। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই অনেক সময় ক্ষতি হয়ে যায়।
একই গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু ধান নয়, বীজতলাও নষ্ট হয়। আবার চারা রোপণের কয়েকদিন পর বৃষ্টি হলে সব তলিয়ে যায়। দ্রুত নালা খনন হলে কৃষকরা তিন ফসলি চাষের সুযোগ পাবে।
কৃষক জফের উদ্দিন দুদু বলেন, নালা না থাকায় বীজ বপন ও চারা রোপণ—সব কিছুতেই দেরি হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যায় না। অনেক সময় আবার নতুন করে চারা রোপণ করতে হয়, এতে খরচ আরও বেড়ে যায়।
বর্গাচাষি শাহারুল আলম বলেন, গত আমন মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে দুই দফায় ধান রোপণ করেছিলাম। কিন্তু দুইবারই পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ঋণ নিয়ে চলতে হচ্ছে।
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল লতিফ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য শুধু ত্রাণ বা ক্ষতিপূরণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তিনি বলেন, রাধাকৃষ্ণপুর এলাকার এই দুই কিলোমিটার অংশে জরুরি ভিত্তিতে নালা খনন করা হলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে।
বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, রাধাকৃষ্ণপুর মৌজায় বিস্তীর্ণ জমিতে ধান চাষ হয়। কিন্তু নালা না থাকায় কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার শিকার। কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুত নালা খনন জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, এলাকাটি তুলনামূলক নিচু হওয়ায় সেখানে ধান ছাড়া অন্য ফসল খুব বেশি হয় না। তবে জলাবদ্ধতা নিরসন করা গেলে তিন ফসলি আবাদ সম্ভব। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে খাল খননের প্রস্তাব দেওয়া হবে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ লাইলাতুল হোসেন জানান, প্রথম পর্যায়ে সদর উপজেলার দুটি খালের তথ্য ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী ধাপে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই এলাকায় খাল খননের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষকদের আশা, দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে এবং সম্ভাবনাময় কৃষিজমিতে ফিরবে নতুন প্রাণ।
এসএইচএ