ঈদে কি ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন, ঘুরে আসুন দর্শনীয় স্থানগুলো

দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। সারা বছরের কর্মব্যস্ততা শেষে ঈদের ছুটিতেই অনেকেই খোঁজেন একটু স্বস্তি, নির্মল আনন্দ। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান প্রকৃতির সান্নিধ্যে, ইতিহাসের ছোয়ায়। আর সেই অনন্য অভিজ্ঞতার জন্য উত্তরের সীমান্তঘেষা জেলা ঠাকুরগাঁও হতে পারে এক আদর্শ গন্তব্য।
ঈদের দিন থেকে জেলার ৫টি উপজেলার বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে ভিড় জমে। আয়তনে ছোট হলেও ঐতিহ্য-ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য ঠাকুরগাঁও এক সমৃদ্ধ জনপদ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি যেমন এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে, তেমনি বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম শাসনামলের নানা স্থাপত্য ও নিদর্শন বহন করছে সময়ের সাক্ষ্য।
বসন্ত-শেষের প্রকৃতিতে উত্তর জনপদ
উত্তরের শীত বিদায় নিচ্ছে ধীরে ধীরে। সকালের সবুজ ঘাসে জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে সূর্যের আলো পড়লে যেন ঝলমল করে সোনার দানা। এমন মনোরম আবহাওয়ায় প্রকৃতির রূপ উপভোগের পাশাপাশি ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্পর্শ নিতে ঘুরে দেখা যেতে পারে ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকটি অনন্য স্থান।
শতবর্ষী সূর্যপুরী আমগাছ
ঠাকুরগাঁও সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী সীমান্তের মণ্ডুমালা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দীর প্রাচীন এক বিশাল সূর্যপুরী আমগাছ। প্রথম দর্শনে এটিকে বটগাছ মনে হতে পারে। সদর থেকে বালিয়াডাঙ্গী চৌরাস্তা পর্যন্ত ভাড়া ৩০ টাকা। শহর থেকে মণ্ডুমালা গ্রামে যাওয়ার একমাত্র বাহন হলো অটো চার্জার। ভাড়া নেবে ৪০-৫০ টাকা। প্রায় দুই বিঘারও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই গাছটির উচ্চতা আনুমানিক ৮০-৯০ ফুট, পরিধি প্রায় ৩৫ ফুট। মূল গাছ থেকে বের হওয়া ১৯টি বিশাল ডালপালা অক্টোপাসের মতো মাটি আঁকড়ে ধরে আছে। তবে এই গাছ পরিদর্শনে গুনতে হবে জনপ্রতি ২০ টাকা। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

এলাকাবাসীর ধারণা, গাছটির বয়স ১৫০ থেকে ২৫০ বছরের মধ্যে। প্রতি বছর প্রায় ১০০-১২০ মণ সুস্বাদু সূর্যপুরী আম ধরে এ গাছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা যেমন আসেন, তেমনি বিদেশি অতিথিদেরও আকর্ষণ করে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়।
রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি
রাণীশংকৈল উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি জেলা শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে। উপজেলা শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পথ গেলেই মালদুয়ার জমিদার রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি। সদর থেকে ৬০-৭০ টাকা বাস ভাড়ায় চলে যাওয়া যায়। বিশাল সিংহদরজা পেরিয়ে লাল রঙের দালানে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিক্টোরিয়ান অলংকরণে নির্মিত স্থাপত্যশৈলী। প্রায় ১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই রাজবাড়ির পাশে রয়েছে কাচারি বাড়ি, দুটি পুকুর এবং রামচন্দ্র (জয়কালী) মন্দির। জমিদার বুদ্ধিনাথ চৌধুরীর উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হয়ে তার ছেলে টংকনাথের আমলে সম্পন্ন হয় এ প্রাসাদ। সময়ের ক্ষয়ে জীর্ণ হলেও এখনো ইতিহাসের গৌরব বহন করছে স্থাপনাটি। যে কোনো সময় যাওয়া যাবে। নেই টিকেটের ব্যবস্থা।
লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পূর্ব আকচা গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর। শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান। জাদুঘরে যাওয়ার একমাত্র বাহন হলো অটোরিকশা। শহর থেকে ভাড়া নেবে ৩০ টাকা। ২০০৬ সালে ‘তৃণমূল লোকজ গ্যালারি’ দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই জাদুঘরে কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার-কুমারসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার নানা উপকরণ সংরক্ষিত আছে। সকাল থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

জাদুঘরে রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি (পলাশী যুদ্ধ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আলোকচিত্র ও দলিল), সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গ্যালারি, আঞ্চলিক ভাষা গ্যালারি (৬৪ জেলার ভাষা শোনার ব্যবস্থা), নদী গ্যালারি (বিভিন্ন নদীর পানি সংরক্ষণ), বিজ্ঞান গ্যালারি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের এমন সমন্বিত উপস্থাপনা দেশের অন্য কোথাও খুব কমই দেখা যায়।
আড়াই'শ বছরের জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ
শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ প্রায় আড়াই'শ বছর পুরোনো। শহর থেকে শীবগঞ্জ বাজারে যেতে বাসে গেলে ভাড়া নেবে ১৫ টাকা, আর বাজার থেকে জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ অটোরিকশায় চেপে ১০টায় যাওয়া যাবে। চুন-সুরকি ও ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির ভেতর-বাইরে লতাপাতা ও ফুলের মনোরম নকশা চোখে পড়ে। চার থামের ওপর নির্মিত প্রবেশপথ, তিন দরজাবিশিষ্ট মূল কক্ষ ও চার কোণায় ক্ষুদ্র মিনার সব মিলিয়ে স্থাপনাটি এক অনন্য স্থাপত্যনিদর্শন। যে কোনো সময় যাওয়া যাবে। নেই টিকেটের ব্যবস্থা।

ছোট বালিয়া জামে মসজিদ
সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বালিয়া গ্রামে অবস্থিত ছোট বালিয়া জামে মসজিদ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ‘জিনের মসজিদ’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, জিন-পরিরা রাতের আঁধারে মসজিদ নির্মাণ করেছিল, কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় গম্বুজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি নির্মাণে উদ্যোগ নেন জমিদার গুলমতি চৌধুরানী। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০০৯ সালে পুনর্নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হচ্ছে। ৪০ টাকা খরচে যে কোনো বাহনে করে যাওয়া যাবে। যে কোনো সময় যাওয়া যাবে। নেই টিকেটের ব্যবস্থা।
হরিপুর রাজবাড়ি
হরিপুর উপজেলায় রয়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো একটি রাজবাড়ি। ১৮৯৩ সালে রাবেন্দ্র চৌধুরী ও তার ছেলে জগেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এই রাজবাড়ি তৈরি করেন। ঠাকুরগাঁও সদর থেকে বাসে করে খুব সহজেই যাওয়া যায় রাজবাড়িটিতে। এর প্রধান আকর্ষণ দ্বিতীয় তলার দেওয়ালের অপূর্ব কারুকাজ, লতাপাতার নকশা আর রাজা জগেন্দ্র নারায়ণের চৌদ্দটি আবক্ষ মূর্তি। ভবনটির পূর্বপাশে রয়েছে একটি শিব মন্দির এবং এর সামনে একটি নাট মন্দির।

অনেক আগে এই রাজবাড়ির মধ্যে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। ১৯০৩ সালে বাড়ির পাশে আরও একটি রাজবাড়ি নির্মিত হয়। সব মিলিয়ে অপূর্ব এই রাজবাড়ি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে হরিপুর উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। বাসে বা অটোরিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা। বাস বা অটোরিকশায় জনপ্রতি ভাড়া সাধারণত ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। যে কোনো সময় যাওয়া যাবে। নেই টিকেটের ব্যবস্থা।
এ ছাড়া সদর উপজেলার ঢোলারহাট মন্দির, শালবাড়ি মসজিদ ও ইমামবাড়া, রাণীশংকৈল উপজেলার বাংলা গড়, জগদল রাজবাড়ি, বেলে পাথরে নির্মিত কূপ ও শিলালিপি, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার গড়খাঁড়ি দুর্গ, পীরগঞ্জের ঐতিহাসিক রাজভিটা, সাগুনি রাবার ড্যাম, হরিপুরের রাজবাড়িসহ নানা ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে দেখতে পারেন পর্যটকরা।
বাড়িতে বসে ঈদের আনন্দ যতটা উপভোগ করা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যখন পরিবার-পরিজনকে নিয়ে বের হওয়া যায় ঐতিহ্যের সন্ধানে। প্রাচীন স্থাপনা, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও হতে পারে এবারের ঈদ ভ্রমণের আদর্শ ঠিকানা। ইতিহাসের স্পর্শ, প্রকৃতির প্রশান্তি আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এই তিনের মেলবন্ধনে ঠাকুরগাঁও ডাকছে আপনাকে। এবার ঈদে হোক ভ্রমণ, হোক নতুন করে আবিষ্কার নিজের ঐতিহ্য।
এএমকে