৭৯ বছরেও স্বাদে অনন্য গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী, জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষা

ভুট্টা আর মরিচের জন্য উর্বর উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধা। তবে কৃষিপণ্যের পাশাপাশি এই জেলার আরেকটি পণ্যের পরিচিতি রয়েছে- ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি রসমঞ্জুরী। প্রায় আট দশক ধরে স্বাদে ও গুণে অনন্য এই মিষ্টি শুধু গাইবান্ধার মানুষের গর্বই নয়, বরং সারাদেশে পরিচিত একটি সুস্বাদু খাদ্যপণ্য। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও এত দীর্ঘ সময়ের জনপ্রিয়তা ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায় এখনো স্থান পায়নি গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী। দ্রুত জিআই স্বীকৃতির দাবি ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের।
রসমঞ্জুরীর ইতিহাস
গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। শহরের সার্কুলার রোড এলাকায় ‘রমেশ সুইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় রমেশ চন্দ্র ঘোষ ভারতের উড়িষ্যা থেকে একজন দক্ষ কারিগর এনে প্রথম রসমঞ্জুরী তৈরি শুরু করেন। শুরুতে স্থানীয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে এর ব্যতিক্রমী স্বাদ সবার মন জয় করে নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধার সীমানা পেরিয়ে রসমঞ্জুরীর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। একপর্যায়ে দেশের বাইরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে রমেশ ঘোষের মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। এছাড়াও গাইবান্ধা শহরে গড়ে উঠেছে একাধিক বিখ্যাত মিষ্টির দোকান, যেখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শত শত কেজি রসমঞ্জুরী।

যেভাবে তৈরি হয় রসমঞ্জুরী
গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কারিগর নূরে আলম জানান, রসমঞ্জুরী তৈরির প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ও দক্ষতার কাজ। প্রথমে গরুর দুধ ফুটিয়ে হালকা ঠান্ডা করে ছানা তৈরি করা হয়। এরপর সেই ছানার সঙ্গে ময়দা, চিনি ও সুজি মিশিয়ে আঠালো মণ্ড তৈরি করা হয়। এতে সাদা এলাচের গুঁড়া যোগ করে হাত দিয়ে ভালোভাবে মাখানো হয়।
এরপর মণ্ড থেকে ছোট ছোট গুটি তৈরি করা হয়। আগে এসব গুটি পুরোপুরি হাতে তৈরি করা হলেও বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক জায়গায় স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে গুটিগুলো উত্তপ্ত আগুনে চিনির সিরায় প্রায় আধাঘণ্টা জাল দিয়ে সিদ্ধ করা হয়।
অন্যদিকে বড় কড়াইয়ে দুধ দীর্ঘ সময় ধরে জাল দিয়ে ঘন ক্ষীর তৈরি করা হয়। প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা জাল দেওয়ার পর ১০০ কেজি দুধ কমে ৩০ থেকে ৩৭ কেজি ক্ষীরে পরিণত হয়। পরে সেই ঘন ক্ষীরের মধ্যে সিদ্ধ গুটিগুলো ডুবিয়ে দিলে তৈরি হয় রসে টইটুম্বুর রসমঞ্জুরী।
স্বাদে অতুলনীয়
রসমঞ্জুরী শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি গাইবান্ধার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। কোমল, রসালো ও ঘন ক্ষীরের মিশেলে তৈরি এই মিষ্টির স্বাদ একবার গ্রহণ করলে তা সহজে ভুলে থাকা যায় না।
বিয়ে, দাওয়াত, উৎসব কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—সব আয়োজনেই রসমঞ্জুরীর আলাদা কদর রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে প্রবাসী স্বজনদের জন্য উপহার হিসেবে এই মিষ্টি পাঠানোর প্রচলনও রয়েছে।
কুড়িগ্রামের বাসিন্দা বেসরকারি এনজিও কর্মী সিরাজ উদ্দিন বলেন, গাইবান্ধায় শ্বশুরবাড়িতে এসেছি। এখানে এলে রসমঞ্জুরী ছাড়া যাওয়া হয় না। এ জেলার অত্যন্ত সুস্বাদু মিষ্টি রসমঞ্জুরী।
এখানে এসে রসমঞ্জুরী না খেলে মনে হয় মিষ্টি খাওয়াটাই অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। বাড়ি ফেরার পথে আবার কিনে নিয়ে যাবো পরিবারের জন্য।
এসময় গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডারে মিষ্টি কিনতে আসা ব্যাংক চাকরিজীবি আব্দুল করিম বলেন, স্বাদে অতুলনীয় আমাদের গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী। আমরা যেকোনো আতিথিয়েতায় সবার আগে এটাকে রাখি।
স্থানীয়দের মতে, রসমঞ্জুরী শুধু একটি খাবার নয়, এটি গাইবান্ধার সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। এর স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে এটি ইতোমধ্যে জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এমনকি জেলার জনপ্রিয় স্লোগানেও স্থান পেয়েছে এই মিষ্টি, ‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ।’

গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কবি রজতকান্তি বর্মণ বলেন, রসমঞ্জুরী আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এটির এমন প্রভাব পড়েছে জেলার ব্রান্ডিং পণ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এটি অবশ্যই ভৌগোলিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবিদার।
ভোক্তাদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গাইবান্ধা শহরে ছোট-বড় অন্তত ২৫টি রসমঞ্জুরীর দোকান গড়ে উঠেছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও বড় বাজারগুলোতেও অন্তত অর্ধশত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি করছে।
একেকটি বড় দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি রসমঞ্জুরী তৈরি হয়। এর একটি অংশ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়, আবার কিছু পরিমাণ প্রবাসীদের মাধ্যমে বিদেশেও পৌঁছে যায়।
রমেশ সুইটসের স্বত্বাধিকারী ও হোটেল-মিষ্টি রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র ঘোষ বলেন, “গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী দেশের বাইরে পর্যন্ত সুনাম কুড়িয়েছে। এই মিষ্টি কিনতে এসে মানুষের মাঝে যে আনন্দ দেখা যায়, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। রসমঞ্জুরীকে কেন্দ্র করে এখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।” সময়ের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিকেজি রসমঞ্জুরী এখন ৩৮০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের মতে, রসমঞ্জুরী দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে দূরবর্তী বাজারে সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। গরমকালে এটি সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ভালো থাকে। এরপর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাদের দাবি, যদি সরকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে, তাহলে এই মিষ্টি দেশের বাইরে আরও বড় বাজার পেতে পারে এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব আয় করতে পারে।
স্বীকৃতির অপেক্ষা
সর্বশেষ গেল বছরের ৩০ এপ্রিল নতুন করে ২৪টি দেশীয় পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে জিআই পণ্যের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫টিতে। নতুন স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে— সিরাজগঞ্জের গামছা ও লুঙ্গি, মিরপুরের কাতান শাড়ি, সিলেটের মণিপুরি শাড়ি, কুমিল্লার খাদি, কুমারখালীর বেডশিট, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলা ও এর বীজ-গাছ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কির সন্দেশ, নওগাঁর নাক ফজলি আম, মুন্সিগঞ্জের পাতক্ষীর, দিনাজপুরের বেদানা লিচু, বরিশালের আমড়া, অষ্টগ্রামের পনির, কিশোরগঞ্জের রাতা বোরো ধান, গাজীপুরের কাঁঠাল, শেরপুরের ছানার পায়েস, সুন্দরবনের মধু, গোপালগঞ্জের ব্রোঞ্জের গহনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি, মাগুরার হাজরাপুরী লিচু, ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই, মধুপুরের আনারস এবং নরসিংদীর লটকন।
তবে এতগুলো নতুন পণ্য স্বীকৃতি পেলেও এখনো তালিকায় স্থান পায়নি গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি রসমঞ্জুরী, যা প্রায় ৭৮ বছর ধরে জেলার গর্ব হিসেবে পরিচিত।
গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, সবদিক থেকেই গাইবান্ধাকে পিছিয়ে রাখা হয়। ব্যত্যয় ঘটেনি এই খাদ্য পণ্যের স্বীকৃতির বেলাতেও। প্রায় আট দশক বছর ধরে দেশে এমনকি বিদেশেও সুনাম ছড়িয়েছে আমাদের রসমঞ্জুরী। এটির জিআই স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের যৌক্তিক দাবি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব চৌধুরি বলেন, রসমঞ্জুরী এ অঞ্চলের একটি সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। যেটির সুনাম এখন দেশ পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। এটি ইতোমধ্যে জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এটিকে জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আরকে