ঈদের ছুটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে স্থানগুলো ঘুরে দেখতে পারেন

প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী আর দিগন্তজোড়া আমবাগানের জেলা আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যটকদের কাছে সবসময়ই এক রহস্যময় আকর্ষণের নাম। সুলতানি আমলের রাজকীয় মসজিদ থেকে শুরু করে লাল মাটির টিলা ও তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলামিত্রের সংগ্রহ শালাসহ—সবই ছড়িয়ে আছে এই জেলায়। আপনি যদি একদিনের ঝটিকা সফর বা কয়েকদিনের অবকাশ যাপনে এখানে আসতে চান, তবে আপনার তালিকায় শুরুতেই থাকবে ‘সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’ খ্যাত ছোট সোনা মসজিদ।
জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই মসজিদে পৌঁছাতে সময় লাগবে এক ঘণ্টার কিছু বেশি। শহর থেকে মাহিন্দ্রো বা সিএনজিতে করে অথবা জেলা শহরের শান্তিমোড় এলাকা থেকে প্রাইভেটকার ভাড়া করে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট হয়ে অনায়াসেই এখানে যাওয়া যায়। কালো পাথরের অপূর্ব খোদাই করা এই মসজিদে কোনো প্রবেশ মূল্য নেই এবং এটি সারাদিনই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
সোনা মসজিদের খুব কাছেই অর্থাৎ মাত্র আধা কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন তোহাখানা কমপ্লেক্স। শাহ সুজার আমলের এই দ্বিতল প্রাসাদ ও শাহ নেয়ামত উল্লাহর (রহ.) মাজার-সংলগ্ন দিঘি পর্যটকদের প্রশান্তি দেয়। পায়ে হেঁটেই আপনি এই দুই স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

এ ছাড়া, এই ঐতিহাসিক এলাকা থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দর। বিশাল সব মালবাহী ট্রাকের ব্যস্ততা আর সীমান্ত বাণিজ্যের কর্মচাঞ্চল্য দেখতে এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন। স্থলবন্দর এলাকা পার হয়ে সামান্য গেলেই দেখা মিলবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মিলনস্থল জিরো পয়েন্ট। সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের অনুমতি সাপেক্ষে পর্যটকরা দুই দেশের সীমানা রেখা দেখার সুযোগ পান, যা ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়।
জেলা শহরে ফেরার পথে আপনি দেখে নিতে পারেন স্থানীয়ভাবে 'কুঁজো রাজার বাড়ি' নামে পরিচিত কানসাট জমিদার বাড়ি। ১৮৬৭ সালে নির্মিত এই প্রাসাদের ১৬টি কক্ষ এবং চমৎকার কারুকার্য আপনাকে ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যাবে। জমিদার বাড়ির খুব কাছেই অবস্থিত এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কানসাট আমবাজার। বিশেষ করে মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে আপনি যদি এখানে যান, তবে মাইলের পর মাইল শুধু আমের ঝুড়ি আর শত শত ট্রাকের ব্যস্ততা দেখে মুগ্ধ হতে বাধ্য হবেন। শহর থেকে কানসাটে পৌঁছাতে বাস বা সিএনজিতে সময় লাগে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মিনিট।

এ ছাড়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খোঁজে যারা বেরিয়েছেন, তাদের জন্য আরেকটি আদর্শ দর্শনীয় স্থান হলো বাবুডাইং। শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্থানটি বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু-নিচু লাল মাটির টিলা আর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত। তা ছাড়া, এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি। ১৯৭৯ সালে তিনি এই দুর্গম এলাকায় এসেছিলেন এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে এক ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি ধরে রাখতে এলাকাটি আজও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অত্যন্ত আবেগ ও শ্রদ্ধার জায়গা। এই স্থানটিতে নিজস্ব গাড়ি বা সিএনজি নিয়ে এখানে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু গ্রাম্য আবহে হারাতে চাইলে যেতে পারেন বরেন্দ্র অঞ্চলের নাচোল উপজেলার টিকইল গ্রামে, যা এখন 'আলপনা গ্রাম' নামে পরিচিত। শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামের প্রতিটি মাটির ঘরের দেয়ালে নারীদের হাতে আঁকা আলপনা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। নাচোলে যাওয়ার জন্য বাস বা সিএনজি ব্যবহার করা যায়।

জেলার ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো নাচোলের রাউতাড়ায় অবস্থিত ইলামিত্র সংগ্রহশালা। তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ‘নাচোলের রানী’ খ্যাত ইলামিত্রের স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে একটি লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে। শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানে পৌঁছাতে বাস বা সিএনজি ব্যবহার করা যায়।
এ ছাড়া, বিকেলের অবসরে মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত মহানন্দা পার্ক বা শিশুদের নিয়ে শহরের কালেক্টরেট শিশু পার্কে সময় কাটানো যায়। শিশু পার্কে প্রবেশের জন্য সাধারণত ২০-৩০ টাকার টিকিট প্রয়োজন হয় এবং এটি সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে।
হোটেল ও মোটেল সুবিধা
পর্যটকদের থাকার জন্য জেলা শহরে এখন বেশ আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। উন্নত সুযোগ-সুবিধার জন্য জেলা শহরে অবস্থিত হোটেল স্কাই ভিউ ইন পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। এ ছাড়া, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী থাকার জন্য হোটেল রাজ, হোটেল আল-নাহিদ বা হোটেল স্বপ্নপুরী বেশ জনপ্রিয়। এসি ও নন-এসি রুমের মানভেদে ভাড়া সাধারণত ১,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। আপনি যদি আরও নিরিবিলি ও গ্রামীণ পরিবেশে থাকতে চান, তবে আম বাগান ঘেরা দিঘি রিসোর্ট বা শিবগঞ্জের সরকারি পর্যটন মোটেলে থাকতে পারেন।
যানবাহন ও ভাড়া
জেলা শহর থেকে দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য অটোরিকশা ও সিএনজিই বেশ সহজলভ্য, তবে বাসেও যাতায়াত করা যায়। আপনি যদি সোনামসজিদ, স্থলবন্দর বা জিরো পয়েন্ট ভ্রমণে যেতে চান এবং দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছাতে চাইলে শেয়ার্ড সিএনজিতে ১০০-১২০ টাকায় যাওয়া যায়। পুরো একটি সিএনজি রিজার্ভ করলে আসা-যাওয়াসহ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা গুনতে হতে পারে। শহর থেকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে আপনার সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মতো। পথে থাকা কানসাট জমিদার বাড়ি ও আমবাজার দেখার জন্য ৫০-৬০ টাকা সিএনজি ভাড়ায় মাত্র ৪৫ মিনিটেই পৌঁছানো সম্ভব। কানসাট বাজার থেকে খুব সামান্য ভাড়ায় রিকশা বা ভ্যানে চড়ে জমিদার বাড়িতে যাওয়া যায়।

প্রকৃতি ও ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে বাবুডাইং এলাকায় যাওয়ার জন্য সরাসরি কোনো বাস নেই। সেক্ষেত্রে শহর থেকে অটো বা সিএনজি রিজার্ভ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আসা-যাওয়াসহ একটি অটোবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সাধারণত ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যায় এবং পৌঁছাতে মাত্র ৩৫-৪০ মিনিট সময় লাগে।
তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ইলামিত্র সংগ্রহশালা ও আলপনা গ্রাম টিকইলে যাওয়ার জন্য আপনাকে নাচোলের পথ ধরতে হবে। বাসে ৪০-৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে প্রায় এক ঘণ্টায় নাচোল সদর পৌঁছানোর পর সেখান থেকে স্থানীয় অটো বা সিএনজিতে ২০-৩০ টাকায় এই ঐতিহাসিক ও শৈল্পিক গ্রামগুলোতে পৌঁছে যাবেন।
এএমকে