ঈদের ছুটিতে ভ্রমণবিলাসীদের পছন্দ রংপুরের ‘ভিন্ন জগত’

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। আর ঈদের ছুটি মানেই ভ্রমণবিলাসী মনে হাজারো জল্পনা-কল্পনা। ঈদের আগে কিংবা পরে কোথায় ঘুরতে যাবেন, কীভাবে কাটানো যাবে ছুটি—এ নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। কারণ ঈদের ছুটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভ্রমণবিলাসী মনের সুতো।
তবে ঈদের ছুটিতে যান্ত্রিক জীবনে চেনা গণ্ডি ছেড়ে নির্মল স্নিগ্ধ পরিবেশে চলে যেতে অনেকেরই ইচ্ছে হয়। অন্তত একদিনের জন্য সব ব্যস্ততা ভুলে সুন্দর একটি দিন কাটাতে! যেখানে সৌন্দর্য আর উপভোগের উপাদানের কমতি নেই। মানুষের এই স্বভাবসুলভ ইচ্ছাকে পূরণ করতে আজ আমরা জানাবো ‘ভিন্ন জগত’ এর ভিন্নতার গল্প’।
বাংলাদেশের প্রথম প্লানেটেরিয়ামে সাজানো স্পট ‘ভিন্ন জগত’। প্লানেটেরিয়ামে ঢোকার পর আপনি হারিয়ে যাবেন গ্রহ-নক্ষত্রের ভিড়ে। জানতে পারবেন ‘মহাবিস্ফোরণ বা বিগব্যাং’-এর মাধ্যমে পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস।
বিস্ময়কর এই প্লানেটেরিয়াম সমৃদ্ধ ভিন্ন জগতের অবস্থান রংপুরের পাগলাপীর বাজার থেকে একটু দূরে গঙ্গাচড়া উপজেলার গঞ্জিপুরে। এটি এ জেলার সবচেয়ে বড় পিকনিক স্পট ও পর্যটনকেন্দ্র। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ভিন্ন জগতে প্রবেশ পথে গুণতে হয় টিকেট মূল্য। এখানে প্রবেশের পর লোহার ব্রিজ, তা পেরোলেই জগতটা যেন ভিন্ন হয়ে যায়।
ভিন্ন জগতের ভিন্নতায় যা রয়েছে
না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না, ভিন্ন জগতের ভেতরে আরেকটি ভিন্নজগত রয়েছে। সবুজের সমারোহে ঘেরা এ বিনোদন স্পটে প্লানেটেরিয়াম ছাড়াও রয়েছে, আজব গুহা, তাজমহল, মস্কোর ঘণ্টা, আইফেল টাওয়ার, চীনের প্রাচীর। চলছে ট্রেন, উড়তে চাইছে উড়োজাহাজ। সবুজে ঘেরা গাছগাছালিতে বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। দিনভর হইহুল্লোড় মেতে উঠতে পারেন। ক্লান্তি আসবে না।

নিরিবিলি সময় কাটাতে এখানে আবাসন সুবিধাও রয়েছে। আরও আছে থ্রিস্টার মডেলের ড্রিম প্যালেস। পাখিদের অভয়ারণ্য। শপিংমল, আধুনিক কনফারেন্স ও কমিউনিটি সেন্টার, স্কিল টেস্ট রোবট জোন। বিশাল সুইমিংপুলও রয়েছে ভিন্ন জগতে। যেখানে স্বল্প টাকায় মিলবে সমুদ্রের অনুভূতি!
শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রাইড
শিশুদের বিনোদনেরও কমতি নেই। রয়েছে শিশুকানন, মেরিগো রাউন্ড, হেলিকপ্টার ফ্লাইজোন, নাগরদোলা, ক্যাঙ্গারু মুভিং, স্পাইডার জোন, বাম্পার কার, রেসিং হর্স, সি-প্যারাডাইস, মকি ট্রেন, জলতরঙ্গ, থ্রিডি মুভি, বরফের দেশ, স্পেস জার্নি, শাপলা চত্বর, বীরশ্রেষ্ঠ ও ভাষাসৈনিকদের ভাস্কর্য এবং বিশাল আকৃতির নিজস্ব লেকে নৌ-ভ্রমণ ও মৎস শিকারের ব্যবস্থা। ভিন্ন জগতের যে কোনো রাইড মিলবে ২০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই।
ওয়াটার পার্কে সমুদ্রের ঢেউয়ের অনুভূতি
ভিন্ন জগতের ওয়াটার পার্ক যেন আনন্দ, রোমাঞ্চ ও প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানা!
গরমের ক্লান্তি ভুলে পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো এক অসাধারণ পার্ক এটি। আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নির্মিত ওয়াটার পার্কে রয়েছে নিরাপদ, পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ পরিবার-বান্ধব পরিবেশ।

এ পার্কে অন্যতম আকর্ষণ হলো-বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের বাস্তব অনুভূতি, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় রঙিন পানির খেলা ও গানের তালে তালে পানির ঝর্ণা ধারায় নৃত্যানন্দ। সব বয়সের জন্য উপযোগী ওয়াটার পার্কে রয়েছে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা ও বিশ্রাম জোন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও মান রয়েছে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও স্টাফ।
রয়েছে দেশের প্রথম বিজ্ঞান পার্ক
আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও, নিউটনসহ বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীদের আবিস্কারের সূত্র বা সেগুলোর ব্যবহারিক, পদার্থ-রসায়ণ-গণিত আর জীব বিজ্ঞানের পুথিগত বিদ্যার বাস্তব প্রয়োগ দেখানো বা শেখানোর জন্য রয়েছে ‘সাইন্স পার্ক’। এটি বেসরকারিভাবে নির্মিত দেশের প্রথম আউটডোর সাইন্স পার্ক।
বিনোদনের পাশাপাশি এখানে প্রয়োগিকভাবে দেখানো হয়েছে বিজ্ঞানের নানা বিষয়। প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞান শেখার চেয়ে সরাসরি বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা ও বোঝার সুযোগ। যা অনেক বেশি মজাদার।
সাইন্স পার্কের উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে মজার আম আয়না, পেরিস্কোপ, ক্যালাইডস্কোপ, পিন হোল ক্যামেরা, সুর নল, নিউটনের কালার ডিস্ক ও গতিসূত্রের বাস্তব ও প্রয়োগ, পেন্ডুলামের সাহায্যে শক্তি ও ভরবেশের সংরক্ষণশীলতার প্রমাণ, ভাসমান বলের সাহায্যে বার্নোলীর সূত্রের প্রমাণ, চক্রজপথে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব, হেলানো তল, কপিকল এবং লিভারের মাধ্যমে প্রাপ্ত যান্ত্রিক সুবিধার বাস্তব প্রয়োগ, আর্কিমিডিসের ড্র, অবতল পৃষ্ঠে শব্দের প্রতিফলন, প্রতিধ্বনি নল, জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন মডেল, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কেন্দ্র বিমুখী বল-এর বাস্তব প্রয়োগ, পিথাগোরাসের উপপাদ্যের প্রমাণ, তরঙ্গ গতির মডেল, অধিবৃত্তাকার প্রতিফলক, বেলা টাওয়ার, বারটল পেন্ডুলামসহ রয়েছে ৪০টি মডেল। এ ছাড়া, পুরে সাইন্স পার্কের দেয়ালে অঙ্কিত রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণার ছবি।

রয়েছে ড্রিম প্যালেস রিসোর্ট সুবিধা
বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে ভিন্ন জগতে কনসার্টসহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থাও রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রয়েছে একটি তথ্যকেন্দ্র, যা পর্যটকদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়ে ও হারানো জিনিস খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক কিংবা ভ্রমণপ্রেমীদের থাকার জন্য রয়েছে ড্রিম প্যালেস রিসোর্ট বা আবাসন সুবিধা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এই রিসোর্টে পরিবারসহ উপভোগ করতে পারবেন নিরিবিলি ও আরামদায়ক পরিবেশ। রাতে মিঠিমিঠি আলোর খেলায় স্বপ্নময় গল্পে অবকাশ যাপনে খুঁজে পাবেন প্রকৃতির কোলে রাজকীয় অভিজ্ঞতা।
সবুজের সমারোহে পাখির আতিথেয়তা
এখানে রয়েছে সুবিশাল জলাশয়। আর এর চারপাশজুড়ে পরিকল্পিত নানা জাতের শোভা-বর্ধনকারী গাছগাছালিতে থাকা পাখির কিচির-মিচির কলতানে মিলতে পারে প্রশান্তি। দিনে ও রাতের উষ্ণ আতিথেয়তায় পাবেন এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
ভিন্ন জগতে যেটা নজরে আসবে তা হলো, সারাক্ষণ নানা জাতের পাখির কোলাহলে মুখরিত থাকে এটি। গাছে গাছে দেখা যায় নানান প্রজাতির পাখি। সারাদিন খাবারের সন্ধানে এদিক-সেদিক ঘুরে সন্ধ্যা হলেই পাখিরা নীড়ে ফিরে আসে। ভিন্ন জগতে প্রাকৃতিক পরিবেশে ভিন্নতা পাচ্ছে দেশি-বিদেশি হাজারও বৃক্ষের সমাহারে।

অসংখ্য গাছের ছায়ায় এখানে-সেখানে সারাটা দিন ঘুরে বেড়াতে পারেন। ভিন্ন জগতের প্রধান ফটক পার হলেই তিন দিকের বিশাল লেক ঘেরা নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা শেষ হলেই সামনে পড়বে লোহার ১টি ব্রিজ। ব্রিজটি পার হলেই বোঝা যায় ভিন্ন জগতের ভিন্নতা। সবুজ শ্যামল মায়াময় এ স্থানটিতে না গেলে বোঝা যায় না কতটা আকর্ষণীয় এটি। সব মিলিয়ে বিনোদনের এক অপূর্ব সমাহার এই স্পটটি, যা বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
ভিন্ন জগতে কীভাবে আসবেন
উত্তরের বিভাগীয় নগরী রংপুর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে পাগলাপীর বাজার ছেড়ে গঞ্জিপুরে বিশাল এলাকা নিয়ে এই থিম পার্কটি অবস্থিত। প্রায় ১শ’ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ভিন্ন জগতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে প্রচুর দর্শনার্থী ও ভ্রমণানুরাগীরা বেড়াতে আসেন এখানে।
ঢাকার মহাখালী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর এবং গাবতলি থেকে রংপুরগামী বেশ কয়েকটি বিলাস বহুল এসি ও নন এসি বাস রয়েছে। এ ছাড়া, কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুর ও কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে রংপুর বাসে আসতে সময় লাগবে সাড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। ট্রেনে লাগবে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। আকাশপথে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণের পর যে কোনো পরিবহনে করে ভিন্ন জগতে আসা যায়।
রংপুর শহর থেকে সরাসরি ভিন্ন জগতে যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইককে করে যাওয়া যাবে গন্তব্যে।

এ ছাড়া, রংপুর শহরের মেডিকেল মোড় থেকে সৈয়দপুর-নীলফামারী ও দিনাজপুরগামী বাসে চড়েও ভিন্ন জগতের উদ্দেশে যাত্রা করা যাবে। সেক্ষেত্রে নামতে হবে রংপুর সদরের পাগলাপীর বাজার বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে করে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে যাওয়া যায় ভিন্নজগতে। এ ছাড়া, রংপুর থেকে জলঢাকা-কিশোরগঞ্জগামী গাড়িতে ভিন্ন জগতে যেতে পারবেন।
ভিন্ন জগতে গাড়ি পার্কিংয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের জন্য বিভিন্ন মূল্য পরিশোধ করে গাড়ি পার্ক করা যায়। বছরজুড়েই সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ভিন্ন জগতে ভ্রমণ ও আবাসন সুবিধা সম্পর্কিত আরও তথ্য পেতে যোগাযোগ করুন +880 1744 78 68 81 নম্বরে। এ ছাড়া, Vinno Jogot Amusement Park নামে ফেসবুক পেজেও পেতে পারেন বিস্তারিত তথ্য।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে