শেরপুরের দেড়শ বছরের ঐতিহ্য মাষকলাই ডালের আমিত্তি, ইফতারের প্রধান আকর্ষণ

শেরপুরে মাহে রমজানের ইফতারে বিশেষ কদর বেড়েছে মাষকলাই ডাল দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ‘আমিত্তি’র। খেজুর, খুরমা, লাচ্ছি, বোরহানি, কলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, লাড্ডু ও বুন্দিয়ার মতো নানা খাবার থাকলেও রোজাদারদের কাছে ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’র আবেদন যেন আলাদা। ইফতারে ঝাল খাবারের পাশাপাশি মিষ্টি স্বাদের জন্য অনেকেই বেছে নিচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি।
বিজ্ঞাপন
জেলার প্রসিদ্ধ মিষ্টির মধ্যে অন্যতম এই মাষকলাই আমিত্তি। মূলত শরৎকালে তৈরি হলেও এখন রমজান মাসেও ব্যাপকভাবে বানানো হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রমজানে এ মিষ্টির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিপুলসংখ্যক ক্রেতা ভিড় জমাচ্ছেন শেরপুর শহরের ঘোষপট্টি বা গোয়ালপট্টি মহল্লার মিষ্টির দোকানগুলোতে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’র প্রধান উপকরণ মাষকলাই ডাল। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয় আতপ চালের গুঁড়া। শেরপুর শহরের মুন্সিবাজার ঘোষপট্টির দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক মঙ্গল চন্দ্র ঘোষ বলেন, প্রথমে কাঁচা মাষকলাইয়ের ডাল ভালো করে ভিজিয়ে রেখে তা গুঁড়া করতে হয়। এরপর তাতে পরিমাণমতো চালের গুঁড়া মিশিয়ে কাঁচা আমিত্তি তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো গরম তেলে ভেজে চিনির শিরায় কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা হলে তৈরি হয় সুস্বাদু রসালো আমিত্তি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৮০ বছর আগে থেকে শেরপুরে মাষকলাইয়ের আমিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। আগে মূলত শরৎকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা ও ভাইফোঁটা উৎসব উপলক্ষ্যে এই মিষ্টি তৈরি হতো। তবে রোজাদারদের চাহিদার কারণে প্রায় ২০ বছর ধরে রমজান মাসজুড়ে ঘোষপট্টির মিষ্টির দোকানগুলোয় আমিত্তি তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শহরের গোয়ালপট্টি এলাকার নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী ভোলানাথ ঘোষ বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতি বছরই আমিত্তির দাম কিছুটা বাড়ছে। তবে এর গুণগতমান একই রাখা হয়েছে। বর্তমানে শহরের দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার, রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভান্ডার, নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার, প্রেমানন্দ গ্র্যান্ড সন্স ও শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ বিভিন্ন দোকানে প্রতি কেজি আমিত্তি ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি রমজান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ কেজি আমিত্তি বিক্রি হচ্ছে। আর ঘোষপট্টির প্রায় ৮ থেকে ১০টি দোকানে প্রতিদিন মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মণ আমিত্তি বিক্রি হয়।
দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারে আমিত্তি কিনতে আসা শহরের মধ্যশেরী মিয়াবাড়ি এলাকার কলেজশিক্ষক সৈয়দ সলিমুল হক বলেন, এই আমিত্তি অত্যন্ত সুস্বাদু। রমজান মাসে ইফতারে এটি রোজাদারদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে। তাই প্রায় প্রতিদিনই ইফতারে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে আমিত্তি রাখা হয়।
বিজ্ঞাপন
জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, “ইফতারে মাষকলাইয়ের আমিত্তি রোজাদারদের কাছে বেশ প্রিয়। তাই আমার বাসা ও সংগঠনের ইফতার মাহফিলেও এই মিষ্টি রাখা হয়।”
শেরপুরের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ইতিহাস আরও পুরোনো। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড়শ বছর আগে জমিদারি আমলে শেরপুরের নয়আনী, আড়াইআনী, তিনআনী ও পৌনে তিনআনীর জমিদাররা বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই আমিত্তি তৈরি করাতেন। সে সময় ঘি দিয়ে ভেজে তৈরি করা হতো এই মিষ্টান্ন।
দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের অন্যতম স্বত্বাধিকারী অরুন ঘোষ বলেন, তার প্রয়াত বাবা কানাইলাল ঘোষের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন জমিদারদের নানা আয়োজনেই এই আমিত্তি পরিবেশন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি জানান, আমিত্তি তৈরির জন্য প্রথমে ভালো মানের মাষকলাই ডাল ভিজিয়ে রেখে তার কালো ছাল ফেলে দেওয়া হয়। এরপর সেগুলো বেটে বা ব্লেন্ডারের সাহায্যে তরল করা হয়। এতে মেশানো হয় সুগন্ধি চালের গুঁড়ো অথবা এরারুট বার্লি। পরে সেই আঠালো মিশ্রণকে দুই বা তিন প্যাঁচ দিয়ে গরম তেলের কড়াইয়ে ফেলা হয়। সোনালি রং ধারণ করলে সেগুলো তুলে আগে থেকে তৈরি করা চিনির রসে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপরই তৈরি হয় গরম গরম রসালো আমিত্তি।
রাজবল্লভ মিষ্টির দোকানের মালিক ভুলু ঘোষ বলেন, রমজান মাসে তার দোকানেই প্রতিদিন প্রায় তিন মণ আমিত্তি বিক্রি হয়। তবে মাষকলাই ডাল, তেল, চিনি ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা কম লাভে আমিত্তি বিক্রি করছেন।
রমজান মাসে গোয়ালপট্টি এলাকায় গেলেই দেখা যায় অন্যরকম দৃশ্য। বড় বড় কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলে পাক খেতে খেতে পড়ছে আমিত্তি। কিছুক্ষণ পরই সেগুলো সোনালি রং ধারণ করে ছড়িয়ে দিচ্ছে মনমাতানো ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে অনেক পথচারীও থমকে দাঁড়ান। অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে স্বল্প আয়ের মানুষ সবাই ভিড় করছেন এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কিনতে।
গোয়ালপট্টি এলাকায় আমিত্তি কিনতে আসা শহরের সজবরখিলা মহল্লার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমিত্তি খুবই মজাদার মিষ্টি জাতীয় খাবার। সারাদিন রোজা শেষে ইফতারে এটি মুখে দিলে স্বাদ ও ঘ্রাণে মন ভরে যায়। বাচ্চারাও খুব পছন্দ করে। তাই রমজান মাসে প্রায় প্রতিদিনই আমিত্তি কিনে নিয়ে যাই।
তিনি জানান, গত বছর তিনি ১৮০ টাকা কেজি দরে আমিত্তি কিনেছেন। এ বছর সেই দাম বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকা হয়েছে। তবে ভালো জিনিস পেতে হলে একটু বেশি দাম দিতেই হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরাও বলছেন, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হলে মাষকলাই আমিত্তি তুলনামূলকভাবে ভালো খাবার হতে পারে। ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অরুপ সাহা বলেন, মাষকলাই ডাল প্রোটিন, ফাইবার, আয়রন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। এটি হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতেও সহায়ক।
শেরপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মোবারক হোসেন বলেন, মাষকলাই আমিত্তি আঠালো হওয়ায় এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয় না। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে জিলাপি তৈরিতে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড বা হাইড্রোজ ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আমিত্তি তৈরিতে এমন কোনো রাসায়নিক লাগে না। তাই এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ খাবার।
দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বয়ে চলা শেরপুরের মাষকলাই ডালের আমিত্তি এখন শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, বরং জেলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। রমজান এলেই সেই ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
নাইমুর রহমান তালুকদার/আরকে